রাঙামাটিতে বিএনপি প্রার্থীর ইশতেহার প্রত্যাখান করে স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্মজ্যোতি চাকমাকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে পাহাড়ি সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। তবে এই সমর্থনের পেছনে শুধু স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন নয়, বরং পার্বত্য রাজনীতির অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্য ও আধিপত্য রক্ষার হিসাবই মুখ্য বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সমর্থন মূলত আদর্শগতের চেয়ে কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যেখানে রাঙামাটিতে জেএসএসের একচেটিয়া প্রভাব ঠেকানো, পাহাড়ি রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান দৃশ্যমান রাখা এবং ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষাই ইউপিডিএফের প্রধান লক্ষ্য।
রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রাঙামাটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সমীরণ দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) দুই পক্ষই সমর্থন দিয়েছে। ফলে জেএসএস এককভাবে মাঠে শক্ত অবস্থান নিতে পারলেও, এতে ইউপিডিএফ কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এই প্রেক্ষাপটেই আড়ালে থাকা ইউপিডিএফ নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে
ধর্মজ্যোতি চাকমার পক্ষে অবস্থান নেয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধর্মজ্যোতি চাকমা অতীতে জেএসএসের সমর্থনে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ফলে তিনি পার্বত্য রাজনীতিতে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য মুখ হিসেবে বিবেচিত।
সূত্রগুলো আরও জানায়, জেএসএসের দুই পক্ষ একসঙ্গে সমীরণ দেওয়ানকে সমর্থন দেওয়ায় রাঙামাটিতে একটি শক্ত রাজনৈতিক বলয় তৈরি হয়েছে। এর বিপরীতে ইউপিডিএফ নিজেদের সাংগঠনিক অস্তিত্ব ও আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখতে ধর্মজ্যোতি চাকমাকে সমর্থন দেওয়ার কৌশল নিয়েছে।
এদিকে এই আসনে ইউপিডিএফ (প্রসিত গ্রুপ) সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্মজ্যোতি চাকমা এবং বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা সমীরণ দেওয়ানের মধ্যে মূলত পাহাড়ি ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দুইজনই শক্তিশালী পাহাড়ি প্রার্থী হওয়ায় একই ভোটব্যাংকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচনের শুরুতে পাহাড়ি সচেতন নাগরিক সমাজ একক পাহাড়ি প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করে। প্রার্থী মনোনয়নের প্রাথমিক যাচাইয়ে ধর্মজ্যোতি চাকমা চূড়ান্ত হলেও আপিল প্রক্রিয়ায় সমীরণ দেওয়ান টিকে গেলে পুরো নির্বাচনী সমীকরণ বদলে যায়। এতে একক পাহাড়ি প্রার্থীর ধারণা ভেঙে পড়ে এবং ভোট বিভাজনের আশঙ্কা প্রকট হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাহাড়ি ভোট এভাবে বিভক্ত হলে এর সুফল যেতে পারে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভুঁইয়ার পক্ষে। সমতলের ভোটের পাশাপাশি বিভক্ত পাহাড়ি ভোটের একটি অংশ তার ঝুলিতে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে শনিবার ইউপিডিএফ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারকে প্রত্যাখ্যান করে রাঙামাটিতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্মজ্যোতি চাকমাকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানায়।
ধর্মজ্যোতি চাকমা জানান, প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়ে তাকে বিজয়ী করবে। তিনি বলেন, বাধাহীনভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে মাঝেমধ্যে অপরিচিত মোবাইল নম্বর থেকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য হুমকি পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সমীরণ দেওয়ান বলেন, নির্বাচিত হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সব সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে কাজ করবেন। তার বিরুদ্ধে আঞ্চলিক একটি সংগঠনের সমর্থনের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, তিনি এ এলাকার জনগণের মনোনীত প্রার্থী।
শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ভোটের পাল্লা কোন দিকে ঝুঁকবে, তা জানতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন খাগড়াছড়ির ভোটাররা। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা যিনি নির্বাচিত হবেন, তিনি যেন পাহাড়ি-বাঙালি সকল সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জন করে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে জেলা এগিয়ে নেন।


