Home খাগড়াছড়ি কর্মস্থল ফেলে টাঙ্গাইলের বেসরকারি ক্লিনিকে ব্যস্ত চিকিৎসক; পানছড়ির সরকারি হাসপাতালে বন্ধ সিজারিয়ান সেবা

কর্মস্থল ফেলে টাঙ্গাইলের বেসরকারি ক্লিনিকে ব্যস্ত চিকিৎসক; পানছড়ির সরকারি হাসপাতালে বন্ধ সিজারিয়ান সেবা

পাহাড় সমুদ্র ডেস্ক

প্রকাশ : ৯ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২৩

Share

খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তাঁর পদায়ন। কিন্তু সেখানে খোঁজ করলে তাঁকে পাওয়া যায় না। বরং নিয়মিত দেখা মেলে টাঙ্গাইলের মধুপুর ও ধনবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে। সিজারিয়ান অপারেশন থেকে শুরু করে নানা জটিল অস্ত্রোপচারে অবেদনবিদ (অ্যানেসথেটিস্ট) হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেই সেখানে তাঁর ব্যস্ত সময় কাটে।

সরকারি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে বেসরকারি ক্লিনিকে ছুটে বেড়ানো এই চিকিৎসকের নাম ডা. মো. তারিকুল ইসলাম তারেক। তিনি খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া) হিসেবে কর্মরত। তাঁর অনুপস্থিতির কারণে সেখানে গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও এখনো নিয়মিতভাবে সিজারিয়ান অপারেশন চালু করা সম্ভব হয়নি।

এমন পরিস্থিতিতে গত ২৫ মার্চ তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হলেও তিনি তাতে কোনো গুরুত্ব দেননি বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে ডা. তারিকুল ইসলাম পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগ দেন। সেখানে একজন অ্যানেসথেটিস্ট নিয়োগ পাওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকতর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চাহিদা জানায়। পরবর্তী সময়ে সেখানে গাইনি বিশেষজ্ঞ পদায়নও করা হয়। কিন্তু অ্যানেসথেটিস্ট ডা. তারিকুল ইসলাম নানা অজুহাতে দিনের পর দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় সিজারিয়ান অপারেশনের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ সেবা এখনো নিয়মিত চালু করা যায়নি।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, পানছড়িতে যোগদানের আগে তাঁর কর্মস্থল ছিল টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সেখানেও তিনি সরকারি দায়িত্বে অবহেলা করে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে অ্যানেসথেটিস্ট হিসেবে কাজ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি চরমে পৌঁছালে কর্তৃপক্ষ তাঁকে মধুপুর থেকে খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করে পাঠায়।

পানছড়িতে যোগ দিয়েই তিনি প্রথমে বদলিজনিত ছুটির অজুহাতে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। এরপর আবার মধুপুরে ফিরে গিয়ে বিভিন্ন ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারেশনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে অবেদনবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

মধুপুর ও ধনবাড়ী উপজেলার একাধিক বেসরকারি চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিকাংশ ক্লিনিকেই তিনি প্রতিদিন বিভিন্ন অস্ত্রোপচারে অবেদনবিদ হিসেবে কাজ করেন। বিশেষ করে বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার তাঁর ব্যস্ততা সবচেয়ে বেশি থাকে। অনেক সময় একটি অপারেশন শেষ হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট শল্য চিকিৎসক ও ক্লিনিকমালিকদের বলে আরেকটি ক্লিনিকে ছুটে যান তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একটি ওটি রুম থেকে বের হয়েই তিনি ক্লিনিক ম্যানেজারের কাছ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বুঝে নিয়ে আরেকটি ওটির উদ্দেশে রওনা হন। এভাবেই সকাল ১০টা থেকে রাত ১২টা–১টা পর্যন্ত তাঁর ব্যস্ততা চলে।

গত ৫ এপ্রিল রোববার তিনি মধুপুরের ডিজিটাল ক্লিনিক ও চৌধুরী ক্লিনিকসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে অপারেশনে অ্যানেসথেটিস্টের দায়িত্ব পালন করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগের দিন ৪ এপ্রিল শনিবার এবং ৩ এপ্রিল শুক্রবারও তিনি মধুপুর ও ধনবাড়ীর বিভিন্ন ক্লিনিকে একই দায়িত্ব পালন করেন।

এমনকি মধুপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর চাপ বেশি থাকলে সেখানেও তাঁকে অ্যানেসথেটিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

মধুপুরের জামালপুর রোডে অবস্থিত ডিজিটাল হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপক মনিরুজ্জামান বলেন,“আমাদের এখানে বিভিন্ন অপারেশনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে ডা. তারিকুল ইসলাম অ্যানেসথেটিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আমাদের ডিজিটাল হাসপাতালেও তিনি প্রায়ই অজ্ঞানের চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন।”

একই তথ্য নিশ্চিত করেছেন চৌধুরী আউটডোর ক্লিনিকের স্বত্বাধিকারী ডা. জহরলাল চৌধুরী। তিনি বলেন, তাঁদের ক্লিনিকেও তারেক অবেদনবিদ হিসেবে কাজ করেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. তারিকুল ইসলাম বলেন, “আমি পানছড়িতে অফিস করি। তবে অনেক দূরের পথ তো, তাই মাঝেমধ্যে অনুপস্থিত থাকি। আর মধুপুরে আমার সামাজিকতাও রক্ষা করতে হয়।”

পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানোর বিষয়ে তিনি বলেন,
“আমি কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ পাইনি।”

ডা. তারিকুল ইসলামের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অনুতোষ চাকমা বলেন,“বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০ জন চিকিৎসকের বিপরীতে মাত্র ১৩ জন চিকিৎসক রয়েছেন। এর মধ্যে ডা. তারিকুল ইসলাম যোগদানের পর থেকেই দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা করছেন। মাসে কয়েক দিন দায়িত্ব পালন করেন। নানা অজুহাতে অনুপস্থিত থাকেন। ফেব্রুয়ারি মাসে দু-এক দিন অফিস করেছেন। পরে শোকজ করেছি। তিনি শোকজের জবাব না দিয়েই সিভিল সার্জনের কাছে এক মাসের ছুটির আবেদন করেছেন বলে জানতে পেরেছি।”

তিনি আরও বলেন, লোকবল-সংকটের কারণে উপস্থিত স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত কর্মঘণ্টার বাইরেও হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি জেলার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ছাবের বলেন, “ডা. তারিকুল ইসলামের দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে। তিনি বিভিন্ন সময় নানা অজুহাতের কথা বলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুপস্থিত থাকেন। বিষয়টি জানার পর গত মাসে তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে বলেছি। উনি মধুপুরে বা ধনবাড়ীর ক্লিনিকগুলোতে অ্যানেসথেটিস্টের দায়িত্ব পালন করেন, এ বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। আমি এখনই পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে পুনরায় শোকজ এবং বেতন বন্ধ রাখার জন্য বলব।”

সর্বশেষ :

আরও পড়ুন: