ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়িতে রাজনীতির মাঠ ক্রমেই জমে উঠছে। পর্যটননির্ভর এই জেলায় একটিমাত্র সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১১ জন প্রার্থী।
জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে পাহাড়ি আঞ্চলিক দলগুলোর ভোটব্যাংক। সরাসরি প্রার্থী না থাকলেও এই সমর্থনই হয়ে উঠেছে প্রার্থীদের জয়ের হিসাব–নিকাশের বড় ফ্যাক্টর।
প্রায় ২ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের খাগড়াছড়ি জেলা ৯টি উপজেলা, ৩টি পৌরসভা ও ৩৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। জেলার মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১১৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮০ হাজার ২০৬ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৭৩ হাজার ৯০৪ জন। নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন ২৭ হাজারেরও বেশি।
এই বিশাল ভোটার জনগোষ্ঠীর ভোট গ্রহণ হবে ২০৩টি কেন্দ্রে। এর মধ্যে মাত্র ১৪টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিমুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, বাকি ১৮৯টি কেন্দ্রই রয়েছে ঝুঁকির তালিকায়—যা নির্বাচনের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
জাতীয় দল বনাম স্বতন্ত্র শক্তি
এবারের নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টিসহ ৮টি জাতীয় রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। তবে ভোটের লড়াই মূলত সীমাবদ্ধ হয়ে আসছে চারজন প্রার্থীর মধ্যে। বিএনপি ও জামায়াতের দলীয় প্রার্থীদের পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছেন দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী—ধর্মজ্যোতি চাকমা ও সমীরণ দেওয়ান।
ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূইয়া। প্রায় দুই দশক পর সংসদে ফেরার লক্ষ্যে দুর্গম পাহাড়ি জনপদ থেকে শহরের অলিগলি—সবখানেই চলছে তার সরব প্রচারণা। বিএনপির হারানো রাজনৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধারের প্রত্যয় নিয়ে দিন–রাত মাঠে রয়েছেন তিনি।
ওয়াদুদ ভূইয়ার দাবি, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তার সময়ে খাগড়াছড়িতে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছিল। তার ভাষায়, গত ১৫ বছর পাহাড়ি–বাঙালি কারো জন্যই প্রকৃত উন্নয়ন হয়নি। আমি ক্ষমতায় আসার আগেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে তদবির করে এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করেছি। ক্ষমতায় গেলে পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিনা ঘুষে চাকরির ব্যবস্থা করব।
আঞ্চলিক ভোটের হিসাব
খাগড়াছড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফের রাজনৈতিক প্রভাব দীর্ঘদিনের। তারা সরাসরি কোনো প্রার্থীকে সমর্থন না দিলেও, নির্বাচনের ফলাফলে তাদের ভোটব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
এই ভোটের হিসাবেই আশাবাদী দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী। ঘোড়া প্রতীকের প্রার্থী ধর্মজ্যোতি চাকমা উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইছেন। তার পরিকল্পনায় রয়েছে কৃষি, ফল, বাঁশ, বনজ সম্পদ ও পর্যটনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই শিল্প স্থাপন। পাশাপাশি পাহাড়ি ও বাঙালি তরুণদের জন্য স্টার্টআপ তহবিল, নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ এবং দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন তিনি।
অন্যদিকে আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী সমীরণ দেওয়ান বিএনপির বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচনে নেমেছেন। যদিও দীর্ঘদিন দলীয় রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থাকায় ধানের শীষের ভোটে বড় প্রভাব ফেলতে পারবেন না বলে মনে করছেন অনেকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, তার প্রার্থিতা মূলত ধর্মজ্যোতি চাকমার ভোটব্যাংকেই ভাগ বসাতে পারে।
সমীরণ দেওয়ান অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি কোনো আঞ্চলিক সংগঠনের সমর্থনে নির্বাচন করছি না। জনগণের সমর্থন নিয়েই মাঠে নেমেছি। এই কারণেই দল থেকে আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
প্রথমবারের স্বপ্ন ও প্রশাসনের প্রস্তুতি
এদিকে প্রথমবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অ্যাডভোকেট এয়াকুব আলী চৌধুরী। তিনিও সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশে আশাবাদী এবং দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে থাকবে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
সব মিলিয়ে পাহাড়ি এই জনপদে নির্বাচন শুধু একটি আসনের লড়াই নয়—এটি জাতীয় রাজনীতি, আঞ্চলিক প্রভাব ও স্থানীয় উন্নয়নের সমীকরণে এক জটিল কিন্তু উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষার নাম।


