ভোটের মাঠে নেমে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি দল বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক গড়িয়েছে ‘সাপে-নেউলে’। প্রচারণার মাঠে নির্বাচনী ‘বাকযুদ্ধ’ চালিয়ে যাচ্ছেন দুই দলের শীর্ষ নেতাই। এরমধ্যেই কক্সবাজারে মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ছোড়া গুলিতে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া শিশু হুজাইফা সুলতানার জানাজায় দেখা গেল ‘অনন্য দৃশ্য’। দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িয়েছেন এক কাতারে। সুর মিলিয়েছেন সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের একই দাবিতে।
রবিবার বেলা ১১টায় টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল তেচ্ছিব্রিজ এলাকার অনুষ্ঠিত নামাজে জানাজায় উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের বিএনপি প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী ও জামায়াত প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের আমির নুর আহমদ আনোয়ারী। জানাজায় দুই নেতা ছিলেন পাশাপাশি। দুই নেতাই সীমান্তে গুলি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
দুই নেতার উপস্থিতিতে জানাজার মাঠে ভিন্ন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল উল্লেখ করে হোয়াইক্যং ইউপির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজালাল বলেন, হুজাইফার জানাজায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থী সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারের তাগিদ দেন। এখানে কোনো প্রতীক ছিল না, ছিল শোকের পরিবেশ।
গত ১১ জানুয়ারি মিয়ানমার সীমান্তের দিক থেকে আসা গুলিতে আহত হয়েছিল হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ গ্রামের জসিম উদ্দিনের একমাত্র মেয়ে হুজাইফা। স্থানীয় একটি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত সে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার ২৭ দিন পর গতকাল শনিবার সকাল ৯টার দিকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে (নিনস) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সে। গতকাল গভীর রাতে তার মরদেহ বাড়িতে আনা হয়।
সীমান্তের একাধিক সূত্র জানায়, ১১ জানুয়ারি হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সঙ্গে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা), আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) ও নবী হোসেন বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি হয়। অন্যদিকে মিয়ানমার জান্তা বাহিনীও আরাকান আর্মির অবস্থানে বিমান হামলা ও বোমা হামলা চালায়। ওই দিন সকালে রাখাইন রাজ্য থেকে ছোড়া গুলিতে আহত হয় শিশু হুজাইফা।
এ ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা শিশুটিকে উদ্ধার করে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর নেওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। সেখান থেকে ঢাকার নিনসে নেওয়া হয় তাকে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হারুন অর রশিদ তখন জানান, গুলিটি শিশুটির মস্তিষ্কে প্রবেশ করায় তার অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচার করলেও ঝুঁকির কারণে মস্তিষ্কে ঢুকে যাওয়া গুলিটি অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। মস্তিষ্কের চাপ কমানোর জন্য বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে।
জানাজার মাঠে হুজাইফার বাবা জসিম উদ্দিন বলেন, হুজাইফা তাঁর বড় সন্তান। মিয়ানমার সীমান্তে গোলাগুলির শব্দ শুনে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে উঠানে গেলে হঠাৎ গুলি এসে লাগে। যে মাঠে খেলাধুলায় মগ্ন ছিল হুজাইফা, আজ সেই মাঠের পাশের কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হলো। বাবা হিসেবে মেয়ের এমন মৃত্যু সহ্য করার মতো নয়।


