বান্দরবান সদর উপজেলার ক্যমলংপাড়ার অংমেচিং মারমার মেয়ে দনুচিং মারমা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। শিশুটি পড়ুক মারমা ভাষায়, এমনটি চেয়েছিলেন তার মা। ২০১৭ সাল থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার পাঠ্যবই বিতরণ হলেও, দনুচিংয়ের মতো হাজার হাজার শিশু আজও মাতৃভাষায় লেখাপড়া করতে পারছে না।
দনুচিংয়ের মা অংমোচিং মারমা বলেন, “খুব ইচ্ছা ছিল মেয়ে মারমা ভাষায় পড়তে–লিখতে শিখবে। বই দেওয়া হলেও শিক্ষকরা নিজে পড়াতে পারেন না। তাই মাতৃভাষায় পড়াও হচ্ছে না।”
শুধু দনুচিং নয়, তিন পার্বত্য জেলার চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কোনো শিশুই এখন পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ পাননি। পাঠ্যবই থাকলেও, সেই বই পড়ানোর মতো শিক্ষকের অভাব। অভিভাবকরা চাইলেও বর্ণমালা না চেনায় মাতৃভাষায় শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকরা মূলধারার সাধারণ শিক্ষার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত। মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরা ভাষায় প্রণীত পাঠ্যবই তারা পড়তে পারেন না। হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষকই নিজের ভাষায় লিখতে-পড়তে পারেন, কিন্তু ক্লাসে পাঠদান করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই। জেলা পরিষদ থেকে কিছু শিক্ষককে এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিনের মাতৃভাষার প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও তা যথেষ্ট হয়নি।
শিক্ষকরা মনে করেন, মাতৃভাষায় শিক্ষার কার্যক্রম চালাতে হলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ শাখার মাধ্যমে শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তারপরই মাতৃভাষার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব। এছাড়া, জনসংখ্যার বিন্যাস, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও শিক্ষার উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এসব প্রস্তুতিমূলক কাজ না হওয়ায় কার্যক্রম শুরু করা যায়নি।
জাতীয় শিক্ষাক্রম পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) পাহাড় ও সমতলে ছয়টি জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করেছে। ২০১৭ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর শিশুদের মাতৃভাষার বই দেওয়া হচ্ছে। চলতি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে তিন পার্বত্য জেলায় ৬৬ হাজার ৬৮৭ শিশুকে পাঠ্যবই দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে চাকমা ৩৫ হাজার ১৪৫, মারমা ১৮ হাজার ৫১৩ ও ত্রিপুরা ১২ হাজার ৭৫৬।
শিক্ষকরা জানাচ্ছেন, শিশু থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সপ্তাহে চার দিন মাতৃভাষায় একটি করে বিষয় ক্লাস রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির জন্য রুটিনে সপ্তাহে এক দিন রাখা হলেও, কারা কীভাবে পাঠদান করবেন তা বলা হয়নি।
লামা পৌরসভার নুনারবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহেদ সরোয়ার বলেন, “রুটিনে রাখা হলেও পাঠদান কীভাবে হবে, তা বলা হয়নি। তাই কোনো অগ্রগতি হয়নি।”
রোয়াংছড়ি উপজেলার কাইন্তারমুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মংচিং অং মারমা জানান, “আমার বিদ্যালয় এলাকায় মারমা ছাড়া কোনো জনগোষ্ঠী নেই। শিক্ষকেরা মাতৃভাষায় লিখতে-পড়তে পারেন না। এ জন্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শিশুরা মাতৃভাষায় পড়তে পারছে না।”
বান্দরবানের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পরিণয় চাকমা বলেন, “মাতৃভাষায় শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে জেলা পরিষদকে প্রধান ভূমিকা নিতে হবে। সময় সাপেক্ষ হলেও ধীরে ধীরে অগ্রগতি হবে।”
প্রথম আলো থেকে


