Home রাঙামাটি পাহাড়ের বুকে ছয় দশকের বিস্ময়: কাপ্তাইয়ে পিলারহীন ঐতিহ্যবাহী মসজিদ, স্থাপত্যে মুগ্ধ পর্যটকও

পাহাড়ের বুকে ছয় দশকের বিস্ময়: কাপ্তাইয়ে পিলারহীন ঐতিহ্যবাহী মসজিদ, স্থাপত্যে মুগ্ধ পর্যটকও

সবুজ পাহাড়ে ঘেরা শান্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে এক নীরব বিস্ময়। ছয় দশক পেরিয়েও অবিচল রয়েছে এমন একটি মসজিদ, যার ভেতরে নেই কোনো পিলার।

পাহাড় সমুদ্র ডেস্ক

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬, ১১:৫১

Share

কাপ্তাইয়ে পিলারহীন একটি মসজিদ

সবুজ পাহাড়ে ঘেরা শান্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে এক নীরব বিস্ময়। ছয় দশক পেরিয়েও অবিচল রয়েছে এমন একটি মসজিদ, যার ভেতরে নেই কোনো পিলার। স্থাপত্যের দিক থেকে অনন্য এই মসজিদটি অবস্থিত কাপ্তাই উপজেলার কর্ণফুলী পেপার মিলস আবাসিক এলাকায়। ১৯৬৭ সালে নির্মিত মসজিদটি স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘বড় মসজিদ’ নামে।

প্রায় ১৩ হাজার বর্গফুট আয়তনের এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় দুই হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। পিলারহীন বিশাল অভ্যন্তরীণ কাঠামোর কারণে মসজিদের যেকোনো জায়গা থেকে ইমাম বা খতিবকে স্পষ্ট দেখা যায়—যা এর অন্যতম বিশেষত্ব। পাহাড়ি প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি স্থানীয় মুসল্লিদের পাশাপাশি দেশি–বিদেশি পর্যটকদের কাছেও কৌতূহলের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

শ্রমিকদের জন্য নির্মিত এক অনন্য স্থাপনা

মসজিদটির নির্মাণের পেছনে রয়েছে শিল্প ইতিহাসেরও একটি অধ্যায়। পাকিস্তান আমলে কর্ণফুলী পেপার মিলস পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর শ্রমিকদের ধর্মীয় প্রয়োজন বিবেচনায় এই মসজিদটি নির্মাণ করে দাউদ গ্রুপ। নির্মাণের উদ্যোগ নেন আহমেদ দাউদ, যিনি দাউদ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ছিলেন।

মসজিদটির নকশা ও নির্মাণে ব্যবহার করা হয় উন্নতমানের নির্মাণকৌশল। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এতে ব্যবহৃত মার্বেল ও টাইলস আনা হয়েছিল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি থেকে।

স্থাপত্যের ভেতরে বিস্ময়ের ছাপ

মসজিদটির ভেতরে রয়েছে প্রায় ৩৮টি দৃষ্টিনন্দন বাতি। তিন পাশে ২৩টি জানালা এবং মোট ৯টি দরজা রয়েছে। উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব দিক দিয়ে প্রবেশের ব্যবস্থা থাকায় আলো–বাতাসও প্রবেশ করে পর্যাপ্তভাবে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—মসজিদের ভেতরে কোথাও কোনো স্তম্ভ নেই। ফলে মুসল্লিরা যেখানেই দাঁড়ান না কেন, সবার দৃষ্টির সামনে থাকে মসজিদের মিম্বর।

সময়ের সঙ্গে কমেছে জৌলুস

মসজিদের মুয়াজ্জিন মুহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, একসময় এই মসজিদের খুব সমাদর ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কর্ণফুলী পেপার মিলের কার্যক্রম কমে যাওয়ায় মসজিদের গুরুত্বও কিছুটা কমে গেছে। তবুও জুমার নামাজে দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লিরা এখানে আসেন।

তিনি জানান, একসময় মসজিদে খতিব, ইমাম, সহকারী ইমাম, মুয়াজ্জিন ও দুইজন খাদেমসহ মোট ছয়জন কর্মী ছিলেন। বর্তমানে তা কমে তিনজনে দাঁড়িয়েছে।

মসজিদের ইমাম এটিএম আব্দুল্লাহ বলেন, তিনি প্রায় ৫০ বছর ধরে এই মসজিদের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মতে, এত বড় একটি পিলারহীন মসজিদ দেশে আর আছে কি না, তা তাঁর জানা নেই।

রক্ষণাবেক্ষণের সংকটে ঐতিহ্য

বর্তমানে মসজিদটির অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও কর্ণফুলী পেপার মিলের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, দীর্ঘদিন ধরে সঠিক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মসজিদের ছাদ, রং এবং বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। এ জন্য উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

নির্মাণকৌশলের ব্যতিক্রমী উদাহরণ

গণপূর্ত বিভাগের রাঙামাটি উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জয় বড়ুয়া জানান, মসজিদটির ভেতরের অংশে পিলার না থাকলেও চারপাশে পিলার রয়েছে। ভেতরের বিশাল অংশটি নির্মাণ করা হয়েছে লোড বেয়ারিং ওয়াল ও ইনভার্টেড বিম পদ্ধতিতে। উন্নতমানের এই প্রকৌশল ব্যবহারের কারণেই এত বছর পরও মসজিদটি দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

সবুজ পাহাড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই পিলারহীন মসজিদ শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়—এটি এক টুকরো ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণ করা গেলে কাপ্তাইয়ের এই ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও হয়ে উঠতে পারে এক গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান।

সর্বশেষ :

আরও পড়ুন: