গুচ্ছগ্রামের দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ রেশন ঘিরে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট—এমন অভিযোগ উঠেছে খাগড়াছড়িতে। নিম্নমানের খাদ্যশস্য সরবরাহ, কম ওজন দেওয়া এবং তদারকির অভাবকে কাজে লাগিয়ে এই চক্র তিন মাসে কোটি টাকার মুনাফা করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
জেলার ৮১টি গুচ্ছগ্রামের ২৬ হাজার ২২০ জন রেশনকার্ডধারীর জন্য জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসের খাদ্যশস্য বিতরণ শুরু হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী প্রতি মাসে প্রতিটি কার্ডে ৩৫ দশমিক ৯৫ কেজি চাল ও ৪৯ দশমিক ১০ কেজি গম পাওয়ার কথা। সে হিসাবে তিন মাসে প্রতি কার্ডের বিপরীতে বরাদ্দ রয়েছে ১০৭ দশমিক ৮৫ কেজি চাল এবং ১৪৭ দশমিক ৫০ কেজি গম।
কিন্তু বাস্তবে সেই বরাদ্দ ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না—এমন অভিযোগ করেছেন গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা। স্থানীয়দের দাবি, রেশন বিতরণ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি প্রভাবশালী চক্র। এতে স্থানীয় ডিলার, পরিবহন ঠিকাদার, খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী এবং কিছু অসাধু সরকারি কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ভালো মানের খাদ্যশস্য সরিয়ে রেখে নিম্নমানের চাল বা গম বিতরণ করা হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও বিভিন্ন অজুহাতে খাদ্যশস্য কম দেওয়া হচ্ছে।
গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা জানান, তারা সাধারণত সিদ্ধ চাল খেতে অভ্যস্ত হলেও এখন রেশনে দেওয়া হচ্ছে নিম্নমানের আতপ চাল। এই চাল খাওয়ার অযোগ্য হওয়ায় অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন।

স্থানীয় বাজারে যেখানে চালের দাম প্রতি কেজি ৪৮ থেকে ৫০ টাকা, সেখানে রেশন থেকে পাওয়া চাল ব্যবসায়ীরা কিনে নিচ্ছেন ৩২ থেকে ৩৫ টাকায়। এতে প্রতি কেজিতে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত লাভ করছে বাজারচক্রটি।
স্থানীয়দের হিসাবে, প্রতি কেজিতে গড়ে ১৫ টাকা মুনাফা ধরা হলে ২৬ হাজার ২২০টি রেশনকার্ডের বিপরীতে তিন মাসে এই সিন্ডিকেটের সম্ভাব্য লাভ দাঁড়ায় প্রায় ৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, তিন মাস পরপর একই কৌশলে এই অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, তিন মাসে ২৬ হাজার ২২০টি রেশনকার্ডের বিপরীতে মোট ২ হাজার ৮৮৭ টন চাল এবং ৩ হাজার ৮৬৭ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গমের সংকট দেখিয়ে অনেক জায়গায় গমের পরিবর্তে কম পরিমাণ চাল দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ১ কেজির বদলে মাত্র ৭৯০ গ্রাম চাল দেওয়া হচ্ছে। ফলে একদিকে কম পাচ্ছেন কার্ডধারীরা, অন্যদিকে বাড়ছে সিন্ডিকেটের লাভ।
স্থানীয়দের মতে, গুচ্ছগ্রামের রেশনকে ঘিরে একটি অদৃশ্য বাজারচক্র তৈরি হয়েছে। প্রথমে নিম্নমানের খাদ্যশস্য পেয়ে অনেক পরিবার তা বিক্রি করে দেন। এরপর ব্যবসায়ীরা কম দামে সেই খাদ্যশস্য কিনে মজুত করেন। পরে সেগুলো পরিষ্কার বা শুকিয়ে আবার বাজারে বিক্রি করা হয়।
খাগড়াছড়ি সদরের কুমিল্লা টিলা গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আবু তাহের বলেন, “আগে প্রতি কার্ডে প্রায় ৮৬ কেজি সিদ্ধ চাল পেতাম। এখন যে চাল দেওয়া হয় তা এত নিম্নমানের যে খাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়। অনেক সময় গমের বরাদ্দ থাকলেও বলা হয় গম নেই।”
অভিযোগের আরেক দিক তদারকির ঘাটতি। নিয়ম অনুযায়ী রেশন বিতরণের আগে কারিগরি কর্মকর্তার মাধ্যমে খাদ্যশস্যের মান যাচাই করার কথা। একই সঙ্গে বিতরণ কেন্দ্রে একজন ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এসব নিয়ম মানা হচ্ছে না।
দীঘিনালার রশিকনগর (পূর্ব) গুচ্ছগ্রামের ট্যাগ অফিসার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা ত্রিরতন চাকমা জানান, তিনি একটি কাজে মেরুং যাচ্ছেন। তবে তিনি উপস্থিত না থাকলেও রেশন বিতরণ ঠিকমতো হচ্ছে বলে দাবি করেন।
খাগড়াছড়ি কারিগরি কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মীর মোহাম্মদ সেলিম বলেন, তিনি নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন এবং এখনো কোনো খাদ্যগুদাম পরিদর্শন করতে পারেননি। সাবেক কারিগরি কর্মকর্তা ভুবতি বিকাশ চাকমা জানান, অবসরের আগে দীর্ঘ সময় তিনি খাদ্যগুদামের খাদ্যের মান যাচাই করতে পারেননি।
এদিকে অনিয়ম বন্ধে গুচ্ছগ্রামবাসীরা ৯ দফা দাবি জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছে—আগের মতো প্রতি কার্ডে ৮৬ কেজি সিদ্ধ চাল পুনর্বহাল, গমের বরাদ্দ বাতিল, নিম্নমানের খাদ্যশস্য বিতরণ বন্ধ, রেশন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।
খাগড়াছড়ি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জ্ঞান প্রিয় বিদূর্শী চাকিমা বলেন, ঢাকা থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে আমরা সে অনুযায়ী বিতরণ করছি। আমি অসুস্থ থাকায় বাইরে আছি। পরে বিষয়টি নিয়ে কথা বলবো।
জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, গুচ্ছগ্রামের রেশন বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি গুচ্ছগ্রামবাসীর জন্য আতপ চাল ও গমের পরিবর্তে সিদ্ধ চাল সরবরাহের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।


