Home জাতীয় রায় অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন?

রায় অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন?

প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬, ১২:৩০

Share

সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল (ত্রয়োদশ সংশোধনী) করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। আর ১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টা হবেন সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। তবে এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার আলোকে সংসদ যদি সরকারব্যবস্থায় পরিমার্জন বা পরিবর্ধন করে, তা হলে ভিন্ন কিছু হতে পারে বলে মত দিয়েছেন আইনজীবীরা।

রোববার রায় প্রকাশের পর এমন মত দেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল ও মোহাম্মদ শিশির মনির।

সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ৭৪ পৃষ্ঠার এ রায় প্রকাশ করা হয়। রায়টি লিখেছেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। গত ২০ নভেম্বর ওই রায় দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ আদালত।

১৯৯৬ সালে জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগের দাবির মুখে সংবিধানের ১৩তম সংশোধনী হিসেবে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ওই বছরের ২৭ মার্চ সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির প্রবর্তন ঘটে।
এ বিধান অনুসরণ করে ১৯৯৬ সালে সপ্তম, ২০০১ সালে অষ্টম এবং ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যে নির্বাচনগুলো নিয়ে তেমন কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।

কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অগণতান্ত্রিক ও সংবিধানবহির্ভূত উল্লেখ করে আইনজীবী এম. সলিমউল্লাহসহ তিন আইনজীবী হাইকোর্টে একটি রিট করেন।

শুনানির পর তিন বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চ ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রায় দেন।
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধানসম্মত ও বৈধ। এই সংশোধনী সংবিধানের কোনো মৌলিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি।

২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট। ওই বছর রিট আবেদনকারীরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করেন।

আপিলের শুনানি শেষে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে রায় দেন। এতে প্রধান বিচারপতিসহ চারজন বাতিলের পক্ষে ছিলেন।

২০১১ সালের ১০ মে দেওয়া রায়ে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অর্থাৎ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন অগণতান্ত্রিক এবং তা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে তা বাতিলযোগ্য। তবে প্রয়োজনের নিরিখে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে।

এই রায় ঘোষণার সাত দিন পর, অর্থাৎ ১৭ মে অবসরে যান এ বি এম খায়রুল হক। অবসরে যাওয়ার প্রায় ১৬ মাস পর ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। তখন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বিরুদ্ধে রায় পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠে।

পূর্ণাঙ্গ রায় থেকে ‘তবে প্রয়োজনের নিরিখে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে’-এই পর্যবেক্ষণ বাদ দেওয়া হয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে ২০১১ সালের বিতর্কিত রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে গত বছর ২৭ আগস্ট আবেদন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ ব্যক্তি। পরে ১৭ অক্টোবর আবেদন করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২৩ অক্টোবর আরেকটি আবেদন করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এ ছাড়া নওগাঁর রানীনগরের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেনসহ আরও দুটি আবেদন করা হয়।

রিভিউ আবেদনের শুনানি শেষে গত ২৭ আগস্ট প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির বেঞ্চ আপিলের অনুমতি দেন। ২০ নভেম্বর সে আপিলের ওপর রায় দেন আপিল বিভাগ।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, এই রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যে ফরম্যাটে ছিল, সেই ফরম্যাটেই এটি পুনরুজ্জীবিত হলো। এটি কার্যকর হবে এই সংসদের পাঁচ বছর শেষে। এই সংসদ শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে।

সংসদ এটিকে পরিমার্জন করতে পারে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হ্যাঁ। আদালত পুনরুজ্জীবিত করেছেন। অর্থাৎ সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হবেন প্রধান উপদেষ্টা। এখন বর্তমান সংসদ যদি মনে করে জুলাই সনদের আলোকে বা অন্য কোনোভাবে এই বিধানের মধ্যে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন বা সংশোধন করতে চান, তাহলে এটি সম্পূর্ণ সংসদের এখতিয়ার। কারণ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সংবিধান সংশোধন করা যায়।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের রায় বাতিল করেছেন। খালেদা জিয়া যেটা করেছিলেন (১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার), সেটাই ফিরিয়ে আনার রায় দিয়েছেন। এটি পরবর্তী নির্বাচন থেকে কার্যকর হবে, যদি না স্বাধীন সার্বভৌম সংসদ পরিমার্জন করেন। এ রায়টি সবার জন্য বাধ্যতামূলক। তবে মনে রাখতে হবে, সংসদ সংবিধান ও আইনের যে কোনো ধারা সংশোধন বা পরিমার্জন করতে পারেন।

সর্বশেষ :

আরও পড়ুন: