Home কক্সবাজার ৮ বছরে আট ঈদ বাংলাদেশে, একটিও আরাকানের মতো হয়নি — ‘আজ্জু’ মেটাতে নাফ নদীর ওপারে তাকিয়ে ১৪ লাখ রোহিঙ্গা

৮ বছরে আট ঈদ বাংলাদেশে, একটিও আরাকানের মতো হয়নি — ‘আজ্জু’ মেটাতে নাফ নদীর ওপারে তাকিয়ে ১৪ লাখ রোহিঙ্গা

রোহিঙ্গা ভাষায় মনের আশাকে বলে 'আজ্জু'। আর এই দেশে আশ্রয় নেওয়া ১৪ লাখ রোহিঙ্গার কাছে 'আজ্জু' মানে একটাই—দেশে ফেরা। লেদা আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ আলমের প্রশ্নটা তাই বুকে বিঁধে যায়, 'আঁরার আজ্জু হত্যে পূরণ অইবো?'

পাহাড় সমুদ্র ডেস্ক

প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬, ১১:৩৫

Share

রোহিঙ্গা ভাষায় মনের আশাকে বলে ‘আজ্জু’। আর এই দেশে আশ্রয় নেওয়া ১৪ লাখ রোহিঙ্গার কাছে ‘আজ্জু’ মানে একটাই—দেশে ফেরা। লেদা আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ আলমের প্রশ্নটা তাই বুকে বিঁধে যায়, ‘আঁরার আজ্জু হত্যে পূরণ অইবো?’

কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা আশ্রয়শিবিরে গিয়ে দেখা গেল, ঈদের আনন্দ এখানে ফিকে। মোহাম্মদ আলম বলছেন, ‘নিজ দেশে না থাকলে ঈদের আনন্দই থাকে না। সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ, আমরা তাদের মেহমান। কিন্তু মেহমান হয়ে থাকতে কারই বা ভালো লাগে। পরিবেশ থাকলে আজই দেশে চলে যেতাম।’

লেদা থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে টেকনাফের দমদমিয়া সংরক্ষিত বনের পাশে জাদিমুরা আশ্রয়শিবির। আট বছর আগে গড়া এই শিবিরে ঠাঁই হয়েছে ৩৭ হাজার রোহিঙ্গার। কাঁটাতারে ঘেরা শিবিরের পাশেই কক্সবাজার-টেকনাফ আঞ্চলিক সড়ক। সড়কের ওপারে তাকালে চোখে পড়ে নাফ নদী, তার ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের বলিবাজার। এত কাছে, তবু এত দূর।

২০১৭ সালে সহিংসতার মুখে সব ছেড়ে পালিয়ে আসা আবদুল নবী, রফিক উল্লাহরা এই শিবিরেই কাটিয়ে দিয়েছেন একের পর এক ঈদ। অথচ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা ছিল—এবারের ঈদ রোহিঙ্গারা করবেন রাখাইনে নিজ বাড়িতে। সেই প্রশ্ন তুলতেই হেসে ওঠেন শিবিরে বসে থাকা রোহিঙ্গারা। হাসিতে আনন্দ নেই, আছে তিক্ত বাস্তবতার ছায়া।

রফিক উল্লাহ বললেন, ‘ত্রিপলের ছাউনিতে আটটা ঈদ কেটেছে। কোনো ঈদ আরাকানের মতো উৎসবমুখর হয়নি। ঈদের নামাজের পর মা-বাবা, দাদা-দাদিসহ আত্মীয়স্বজনের কবর জিয়ারত করি আমরা। এখানে সেই সুযোগটুকুও নেই। বন্দিজীবন আর ভালো লাগে না।’

গত বছরের ১৪ মার্চ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে সঙ্গে নিয়ে উখিয়ার আশ্রয়শিবিরে এসে লাখো রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতার করেছিলেন। সেখানে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পরের ঈদ রোহিঙ্গারা করবেন জন্মভূমিতে। আবদুল নবী বলেন, ‘সেসবের কিছুই হয়নি।’

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে পালিয়ে আসা গোলজার বেগমের কোলে এই আট বছরে জন্ম নিয়েছে আরও পাঁচ সন্তান। ঘরের একপাশে পান-সিগারেটের ছোট্ট দোকান চালিয়ে সংসার টানছেন তিনি। বললেন, এবারের ঈদ ভালো যায়নি। প্রতি ঈদে গরুর মাংস আর চালের রুটি পরিবেশন করা হতো, অর্থসংকটে এবার তা-ও হয়নি। শিশুদের জন্য কয়েকটি ক্যাম্পে নাগরদোলা ছিল, বড়দের জন্য বিনোদনের কিছুই ছিল না।

মধুরছড়ার আশ্রয়শিবিরে স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে দুই কক্ষের ত্রিপলের ছাউনিতে থাকেন সালামত উল্লাহ। যে খাদ্যসহায়তা পাচ্ছেন তা দিয়ে মাসও চলে না। আগে ক্যাম্পের বাইরে কাজ করে দৈনিক ৩০০-৫০০ টাকা রোজগার করতেন, এখন কড়াকড়িতে তা-ও বন্ধ। আশ্রয়শিবিরে নিরাপত্তা নেই, তহবিলসংকটে শিশুদের স্কুলও বন্ধ। বললেন, ‘ভবিষ্যৎ ভাবলে দিশা হারিয়ে ফেলি।’

মানবিক সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সভাপতি মোহাম্মদ জোবায়ের জানাচ্ছেন, মাথাপিছু খাদ্যসহায়তা আগে ছিল ১৪ ডলার, এখন নেমেছে ১২ ডলারে। আগামী এপ্রিল থেকে তা আরও কমছে। প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হলে তরুণ-কিশোরেরা মাদক ও সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তার। ইতিমধ্যে পাচারের শিকার হচ্ছে শত শত নারী ও শিশু।

বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১৪ লাখ। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরের কয়েক মাসেই এসেছিল ৮ লাখ। এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। উল্টো গত দেড় বছরে নতুন করে ঢুকেছে আরও দেড় লাখ।

ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা জালাল আহমদ বলছেন, এক বছর ধরে রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ আরাকান আর্মির হাতে, যাদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সম্পর্ক তিক্ত। এই পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসন আরও কঠিন।

তবু আশার কথা শোনাচ্ছেন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার নেতা মোহাম্মদ রফিক। তিনি বলছেন, ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে দুই দফায় কয়েক লাখ রোহিঙ্গা আসার পর বিএনপি সরকার আলোচনার মাধ্যমে তাদের ফেরত পাঠাতে পেরেছিল। এবারও তাই বিএনপি সরকারের প্রতি প্রত্যাশা বেশি রোহিঙ্গাদের।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলছেন, দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলেও সরকারের চেষ্টা অব্যাহত আছে। নতুন অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে রাখাইনের অবকাঠামোগত সমস্যা, আর্থিক সংকট ও সংঘাত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে।
‘আজ্জু’ পূরণের অপেক্ষা তাই চলছেই। নাফ নদীর ওপারে জন্মভূমি দেখা যায়, কিন্তু পৌঁছানো যায় না।

সর্বশেষ :

আরও পড়ুন: