Home কক্সবাজার খাদ্যসহায়তা কমছে এপ্রিল থেকে, বিপাকে পড়বেন ১৪ লাখ রোহিঙ্গা

খাদ্যসহায়তা কমছে এপ্রিল থেকে, বিপাকে পড়বেন ১৪ লাখ রোহিঙ্গা

আগামী ১ এপ্রিল থেকে কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গাদের মাসিক খাদ্যসহায়তা কমানো হচ্ছে। জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর আন্তর্জাতিক তহবিল সংকটের কারণে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পাহাড় সমুদ্র ডেস্ক

প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬, ০১:০৪

Share

আগামী ১ এপ্রিল থেকে কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গাদের মাসিক খাদ্যসহায়তা কমানো হচ্ছে। জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর আন্তর্জাতিক তহবিল সংকটের কারণে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে বসবাসরত ২ লাখ ৪৫ হাজার পরিবারের ১৪ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার জীবনে নতুন সংকট তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করছেন শিবিরের নেতারা।

তিন ক্যাটাগরিতে সহায়তা
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, এতদিন প্রতিটি পরিবারকে মাথাপিছু ১২ ডলার করে সহায়তা দেওয়া হতো। নতুন ব্যবস্থায় পরিবারের অবস্থা বিবেচনা করে তিনটি ক্যাটাগরিতে ৭, ১০ ও ১২ ডলার করে সহায়তা দেওয়া হবে।

আরআরআরসি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপার্জনক্ষম সদস্য আছেন এবং নির্ভরশীল সদস্য কম — এমন পরিবার ‘এ’ ক্যাটাগরিতে পড়বে এবং পাবে মাসে ৭ ডলার। মোট পরিবারের ১৭ শতাংশ এই ক্যাটাগরিতে। নারী, শিশু ও নির্ভরশীল সদস্যপ্রধান পরিবারগুলো ‘সি’ ক্যাটাগরিতে পাবে ১২ ডলার, যা মোট পরিবারের ৩৩ শতাংশ। বাকি ৫০ শতাংশ ‘বি’ ক্যাটাগরিতে পাবে ১০ ডলার।

মিজানুর রহমান বলেন, “রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেই ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়লে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।”

অসন্তোষ বাড়ছে
সহায়তা কমানোর খবরে শিবিরগুলোতে অসন্তোষ দানা বাঁধছে। টেকনাফের জাদিমুরা ও পাশের লেদা আশ্রয়শিবিরে চায়ের দোকান, হাটবাজার ও আড্ডায় একই আলোচনা। রোহিঙ্গা নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন, কিন্তু পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছেন না।

লেদা আশ্রয়শিবিরের ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, “মানবিক কারণে বাংলাদেশ ১৪ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে, এর জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু সহায়তা কমানোয় শিবিরে অসন্তোষ বাড়ছে।”

রোহিঙ্গা নেতা আবুল মনছুর বলেন, “১২ ডলারেই একটি পরিবারের ১৫ দিন চলে না। অনেক পরিবার খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। পানি, জ্বালানি ও নিরাপত্তার সংকট তো রয়েছেই। এমন অবস্থায় সহায়তা কমালে বিপর্যয় নেমে আসবে।”

তিন হাজার টাকায় সাত জনের সংসার
জাদিমুরা শিবিরের বাসিন্দা ছৈয়দ করিম (৫০) মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপ থেকে পালিয়ে এসেছেন। আট বছর ধরে স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান নিয়ে ত্রিপলের ছাউনির ঘরে দিন কাটাচ্ছেন। স্বামী-স্ত্রী মিলে মাসে পাচ্ছেন ২৪ ডলার — বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২ হাজার ৯৩৫ টাকা। এই টাকায় সাত সদস্যের সংসার চলে না।

তিনি বলেন, “আগে শিবিরের বাইরে মজুরির কাজ করে দিনে ২০০-৩০০ টাকা আয় করতাম। এখন কড়াকড়ির কারণে সে সুযোগও নেই। সামনে দুঃখকষ্ট আরও বাড়বে।”

আট বছরে ফেরা হয়নি, সংকট বাড়ছে
২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার মুখে পালিয়ে আসা প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গাসহ এখন পর্যন্ত একজনকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। গত দেড় বছরে উল্টো নতুন করে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা শিবিরে যোগ দিয়েছেন।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সভাপতি মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, “আগে ১৪ ডলার থেকে কমিয়ে ৮ ডলার করা হয়েছিল, পরে ১২ ডলারে আনা হয়। এখন আবার ৭ ডলারে নামানো হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।”

জাদিমুরার বাসিন্দা আবদুল নবী বলেন, “আট বছর ধরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি। ফিরে যাওয়ার কোনো অগ্রগতি নেই, উল্টো খাদ্যসহায়তাও কমছে।”

সহায়তা কমলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিশুরা। অপুষ্টি ও পুষ্টিহীনতা মারাত্মক আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিবিরের নেতারা। তহবিল সংকট না কাটলে এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা না বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ :

আরও পড়ুন: