Home কক্সবাজার মাসে ৭ ডলারে চলবে কীভাবে ১২ জনের সংসার? কক্সবাজারের ক্যাম্পে খাবার কমতেই ফুঁসছেন রোহিঙ্গারা

মাসে ৭ ডলারে চলবে কীভাবে ১২ জনের সংসার? কক্সবাজারের ক্যাম্পে খাবার কমতেই ফুঁসছেন রোহিঙ্গারা

উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প ৪। ২০ বছরের রায়জুর হাতে এ মাসে উঠেছে ২৬ কেজি চাল, ১ লিটার তেল, ১ কেজি পেঁয়াজ আর সামান্য ময়দা। এটুকুই। ডাল নেই, মরিচ নেই, হলুদ নেই। আগে যে ৩৯ কেজি চালের সঙ্গে তেল-ডাল-চিনি-পেঁয়াজ-রসুন সব পাওয়া যেত — এবার তার বদলে এসেছে মাত্র ৭ ডলারের প্যাকেজ।

পাহাড় সমুদ্র ডেস্ক

প্রকাশ : ২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪৫

Share

উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প ৪। ২০ বছরের রায়জুর হাতে এ মাসে উঠেছে ২৬ কেজি চাল, ১ লিটার তেল, ১ কেজি পেঁয়াজ আর সামান্য ময়দা। এটুকুই। ডাল নেই, মরিচ নেই, হলুদ নেই। আগে যে ৩৯ কেজি চালের সঙ্গে তেল-ডাল-চিনি-পেঁয়াজ-রসুন সব পাওয়া যেত — এবার তার বদলে এসেছে মাত্র ৭ ডলারের প্যাকেজ।

রায়জু একটাই প্রশ্ন করেছেন, ‘এই সামান্য খাবার দিয়ে পুরো মাস চলব কীভাবে? তার ওপর আমি সন্তানসম্ভবা।’ জবাব নেই কারও কাছে।

বুধবার থেকে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নতুন পদ্ধতিতে মাসিক খাদ্য সহায়তা বিতরণ শুরু হয়েছে। আগে সবাই মাথাপিছু ১২ ডলার পেতেন। এখন পরিবারের অবস্থাভেদে তিনটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে — ৭, ১০ ও ১২ ডলার। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত প্রায় ১৭ শতাংশ পরিবার পাচ্ছে সবচেয়ে কম — ৭ ডলার। আর এই সিদ্ধান্তেই ক্যাম্পজুড়ে তৈরি হয়েছে চাপা ক্ষোভ।

ক্যাম্প ৩-এর বাসিন্দা রমজান আলীর পরিবারে সদস্য ১২ জন। তিনি বলেন, ‘আগে ১২ ডলারেই খেয়ে না খেয়ে দিন কাটত। এখন ৭ ডলারে কীভাবে চলব?’

একই ক্যাম্পের লাল মতির সংসারে স্বামী-স্ত্রী মিলিয়ে ১০ সন্তান। তিনি জানালেন, ক্যাম্পের বাইরে গিয়ে আয়ের পথও বন্ধ। একবার ছেলে বাইরে কাজ করতে গেলে সন্ত্রাসীরা তাকে মিয়ানমারে পাচার করে দেয়। ১ লাখ ৫ হাজার টাকা দিয়ে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। সেই পরিবারের জন্য এখন বরাদ্দ ৭ ডলার।

অভিযোগ করতে এসে ফিরে গেছেন খালি হাতে
ক্যাম্প ৩-এর আব্দুল শুক্কুর ডব্লিউএফপির আউটলেটে গিয়েছিলেন জানতে — কেন তাঁর সহায়তা কমল? উত্তর পাননি। কর্তৃপক্ষ শুধু বলেছে, ‘অভিযোগ দিন।’ কিন্তু কোথায়, কীভাবে — তা বলেনি কেউ। তাঁর ছেলের বয়স ১৮ পেরিয়েছে বলে সহায়তা কমানো হয়েছে, অথচ সেই ছেলে ক্যাম্পের বাইরে যেতে পারে না, কাজও করে না।

একই হতাশা আব্দু ছালামের। বলেন, ‘কী খাব, কীভাবে চলব — কিছুই বুঝতে পারছি না।’

ক্ষুধা বাড়লে অপরাধও বাড়বে
ক্যাম্প ৪-এর মোহাম্মদ ইদ্রিস সরাসরি বলে দিলেন যা অনেকে মনে মনে ভাবছেন। ‘খাবার না পেলে অনেকে বাধ্য হয়ে অপরাধের দিকে যাবে। কিন্তু বাইরে যাওয়ারও পথ নেই। তখন কী হবে?’ নুরুল ইসলামের কথায়ও একই সুর — ‘আগে কোনোমতে ডাল-ভাত জুটত। এখন সেটুকুও নিশ্চিত নয়। মানুষ বাধ্য হয়ে চুরি-ডাকাতিতে জড়িয়ে পড়বে।’

কেন কমল সহায়তা?
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান জানালেন, ২০১৭ সালের পর রোহিঙ্গাদের জন্য বার্ষিক সহায়তা ছিল প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ৪০০ মিলিয়নে। এ বছর কত আসবে, তা-ও অনিশ্চিত — অথচ প্রয়োজন প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার।

তিনি জানান, এই বাস্তবতায় ডব্লিউএফপি ‘প্রয়োজনভিত্তিক’ পদ্ধতিতে সহায়তা বিতরণ শুরু করেছে। যাদের পরিবারে কর্মক্ষম সদস্য আছেন বা ছোট ব্যবসা আছে, তাদের কম দেওয়া হচ্ছে। তিনি এ-ও স্বীকার করলেন, আগের তুলনায় কম পেলে অসন্তোষ হওয়াটা স্বাভাবিক।

উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৪ সালে হঠাৎ তহবিল সংকটে একসময় রেশন ৬ ডলারে নামিয়ে আনতে হয়েছিল। সেই তুলনায় বর্তমান পদ্ধতি কিছুটা পরিকল্পিত হলেও — ক্যাম্পের মানুষের কাছে সংখ্যার এই তারতম্য বড় কোনো সান্ত্বনা দিচ্ছে না।

মঙ্গলবার টেকনাফের ২৪ নম্বর ক্যাম্পে রেশন কমানোর প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন রোহিঙ্গারা। ডব্লিউএফপির আউটলেটের সামনে ভিড় বাড়ছে। কিন্তু উত্তর নেই, সুরাহা নেই।

সর্বশেষ :

আরও পড়ুন: