Home মতামত প্রচারণার ফাঁদে পার্বত্য সংকট

প্রচারণার ফাঁদে পার্বত্য সংকট

পার্বত্য চট্টগ্রামের চলমান উত্তেজনা শুধু জমির অধিকার, স্বায়ত্তশাসন বা শান্তি চুক্তি নিয়েই সীমাবদ্ধ নয়—এটি ক্রমেই এক ধরনের প্রোপ্যাগান্ডা ন্যারেটিভ বা বয়ানের যুদ্ধ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

মামুন মজুমদার

প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৪৫

Share

পার্বত্য চট্টগ্রামের চলমান উত্তেজনা শুধু জমির অধিকার, স্বায়ত্তশাসন বা শান্তি চুক্তি নিয়েই সীমাবদ্ধ নয়—এটি ক্রমেই এক ধরনের প্রোপ্যাগান্ডা ন্যারেটিভ বা বয়ানের যুদ্ধ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর এক্টিভিস্টরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে কৌশলে ব্যবহার করছে। তারা নিজেদের ভুক্তভোগী আর সরকারকে দমনকারী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে বিশ্বব্যাপী সহানুভূতি ও সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করছে।

এই প্রচারণা আসলে সুপরিকল্পিত এবং আবেগী গল্প দিয়ে তৈরি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যেসব ভাষা ও চিত্র সবচেয়ে বেশি সাড়া জাগায়, সেগুলো বেছে নিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো।

যে অভিযোগগুলো সবচেয়ে বেশী প্রচারিত হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে সেনাবাহিনীর হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্যাতন, গ্রেফতার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড উল্লেখযোগ্য।

এসব অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা। জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে যখন এই প্রচারনাগুলো পৌঁছায়, তখন বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে। ফলে বাংলাদেশ সরকারকে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ হয়ে যায়।

আরেকটি শক্তিশালী কৌশল হলো সেনাবাহিনীর উপস্থিতিকে ‘সেনাশাসন’ বলে আখ্যায়িত করা। এতে সেনাবাহিনীকে শান্তি ও স্থিতিশীলতার রক্ষক হিসেবে নয়, বরং একটি দমনমূলক শক্তি হিসেবে দেখানো হয়। এই শব্দচয়নের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়।

এছাড়া তারা নিজেদের “আদিবাসী” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। কেননা, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই ‘আদিবাসী’ পরিচয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এর মাধ্যমে তারা জাতিসংঘসহ নানা বৈশ্বিক সংগঠন ও আন্দোলনের কাছে বৈধতা ও সমর্থন চাইতে পারে। এজন্য বিষয়টিকে তারা শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং এক প্রকার আদিবাসী সংস্কৃতির টিকে থাকার লড়াই হিসেবে তুলে ধরে।

১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি নিয়েও একটি বড় ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছে। তারা দাবি করে, সরকার চুক্তির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। এর ফলে ঢাকার যেকোনো পদক্ষেপকে অবিশ্বস্ত ও অবৈধ হিসেবে প্রচার করা হয়। প্রায় তিন দশক ধরে এমন প্রচারনার ফলে অভিযোগের এই ন্যারেটিভ আন্তর্জাতিক মহলের ব্যাপক সহানুভূতি আদায় করেছে।

সবচেয়ে আবেগপ্রবণ প্রচারণা হলো জমি দখল, উচ্ছেদ ও ‘জাতিগত নির্মূলের‘ অভিযোগ। বলা হয়, পার্বত্য অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করার উদ্দেশ্যে সরকার সেনাবাহিনীকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিতভাবে বাঙালি বসতি স্থাপন করছে, যাতে পার্বত্য জনগোষ্ঠী ক্রমান্বয়ে ক্ষীন, দূর্বল ও নির্মূল হয়ে যায়। এই বর্ণনা শুধু মানবাধিকার সংগঠন নয়, পরিবেশবাদী গোষ্ঠীর কাছেও আবেদন তৈরি করে।

আঞ্চলিক পার্বত্য সংগঠনের ডিজিটাল এক্টিভিস্টদের প্রচারণা কেবল অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নয়—বরং অপপ্রচারের কৌশলও বেশ পরিকল্পিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও, ছবি ও বিভিন্ন গল্প ব্যবহার করে আবেগঘন আবেদন তৈরি করা হয়।

বিদেশে লবিংয়ের মাধ্যমে প্রভাবশালী দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখা হয়। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর সহায়তায় এসব অভিযোগকে বিশ্বাসযোগ্যতা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে জাতিগোষ্ঠীগুলোর প্রবাসী সম্প্রদায়কে সংগঠিত করে প্রতিবাদ, প্রচার ও তহবিল সংগ্রহ করা হয়।

ফলাফলও দৃশ্যমান। সময়ের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন, গবেষণা ও কূটনৈতিক বক্তব্যে ক্রমেই বিচ্ছিন্নতাবাদী আঞ্চলিক পার্বত্য সংগঠনগুলোর প্রচারনা প্রতিফলিত হচ্ছে এবং বাংলাদেশ সরকারকে প্রায়শই কঠোর, সামরিকীকৃত ও সংখ্যালঘু-বিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

এর ফলে সরকার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বা শান্তি স্থাপনের পদক্ষেপ নিলেও, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সবকিছুকে আড়াল করে দেয়। একবার যদি ‘রাষ্ট্রীয় দমননীতির’ বর্ণনা প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে সেটিকে পাল্টানো কঠিন হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু রাজনৈতিক প্রভাবই পড়ে না—অর্থনৈতিক সম্পর্ক, সাহায্য ও বিনিয়োগও প্রভাবিত হয়। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রাষ্ট্রের মধ্যে বিশ্বাসের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

মূলত, পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট এখন প্রচারনার লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। একপক্ষ নিজেকে আদিবাসী অধিকার রক্ষাকারী ও ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরছে, আর অন্যপক্ষ নিজেদের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার রক্ষক দাবি করছে।

সবশেষে বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত আর কেবল ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক বিষয় নয়—এটি এক প্রকার প্রচারনা-যুদ্ধ। উপজাতীয় সংগঠনগুলো তাদের সংগ্রামকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে, যা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে সাড়া ফেলছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকারকে এই প্রচারণা মোকাবিলা করতে হচ্ছে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে। বর্তমান বিশ্বে যেখানে দৃষ্টিভঙ্গিই বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়, সেখানে যে পক্ষ প্রচারনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, সেই পক্ষই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

লেখক: শান্তি ও উন্নয়ন পর্যবেক্ষক

সর্বশেষ :

আরও পড়ুন: