কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) রেশন বরাদ্দ কমে যাওয়ার পর থেকেই ক্যাম্পে একধরনের হাহাকার ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সেই ক্ষোভকে পুঁজি করে একদল সুযোগসন্ধানী রোহিঙ্গা প্রশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তুলছে। ফলে সামান্য অজুহাতেই দলবদ্ধ হয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক তহবিল সংকটের কারণে ডব্লিউএফপি ‘প্রয়োজনভিত্তিক’ সহায়তা পদ্ধতি চালু করেছে। নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ১৭ শতাংশ রোহিঙ্গা পাচ্ছেন মাসে মাত্র ৭ ডলার। প্রায় ৩৩ শতাংশ পাচ্ছেন ১২ ডলার এবং বাকি ৫০ শতাংশ পাচ্ছেন ১০ ডলার করে। এই সামান্য বরাদ্দে পরিবার চালানো যে কার্যত অসম্ভব, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
কুতুপালং ৪ নম্বর বর্ধিত ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ কাইয়ুম বলেন, মানুষ যখন না খেয়ে থাকে, তখন অনেকেই বাধ্য হয়ে ভুল পথে পা বাড়ায়। দিন যত যাচ্ছে, মানুষের কষ্ট তত বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
রোহিঙ্গা নেতা হাফিজুর রহমানও বলছেন একই কথা। তাঁর ভাষায়, মানুষ যখন স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারে না, তখন হতাশা দেখা দেয়। সেই হতাশাই এখন ক্যাম্পে ক্যাম্পে ছড়িয়ে পড়ছে।
কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, বনে কাঠ চুরি
রেশনসংকটের জেরে ক্যাম্পের ভেতরে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষা করাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেশন কার্ড আপডেট বা জরুরি সেবার টোকেন সংগ্রহের সময় কর্মকর্তাদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ। উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী ক্যাম্পে এই শৃঙ্খলাহীনতা সবচেয়ে বেশি প্রকট। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতেও নিয়ম ভাঙার প্রবণতা কমছে না।
পালংখালী বনবিট কর্মকর্তা জানান, ক্যাম্পসংলগ্ন বনাঞ্চলে রাতের আঁধারে কাঠ কাটার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বাধা দিতে গেলে উল্টো হেনস্তার মুখে পড়তে হচ্ছে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের।
কাঁটাতার কেটে দুইশোরও বেশি অবৈধ পথ
রেশনসংকটে জীবিকার সন্ধানে ক্যাম্পের কাঁটাতারের বেড়া কেটে বাইরে যাতায়াত করছেন অনেকে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্যাম্পের বিভিন্ন অংশে দুই শতাধিক অবৈধ প্রবেশপথ তৈরি হয়েছে। এসব পথ ব্যবহার করে কেউ কেউ স্থানীয় এলাকায় গিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
শরণার্থী অপরাধবিষয়ক গবেষক রাফি আল ইমরান বলেন, বৈধ উপায়ে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব না হলে কিছু মানুষ অবৈধ পথে ঝুঁকে পড়ে। সীমিত কর্মসংস্থান ও খাদ্যসংকট মিলিয়ে সামাজিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে মাদক পাচার, অপহরণ ও সংঘবদ্ধ অপরাধে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে র্যাব ও এপিবিএন নজরদারি বাড়িয়েছে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হচ্ছে নিরাপদ প্রত্যাবাসন। সে লক্ষ্যে সরকার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।


