বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার কুরুকপাতা ইউনিয়নের দুর্গম পোয়ামুহুরী এলাকায় এবার হামের উপসর্গ নিয়ে তিন ম্রো শিশুর মৃত্যু হয়েছে, আক্রান্ত হয়েছে আরও ৭৩ জন। কিন্তু এটা নতুন কিছু নয়— প্রতি বছর এই একই এলাকায়, এই একই সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটে, শিশু মারা যায়। তারপরও টিকা পৌঁছায় না দুর্গম পাড়াগুলোতে। স্বাস্থ্য বিভাগের জবাব একটাই— ম্রোরা টিকা নিতে চায় না।
কিন্তু প্রশ্নটা উল্টো দিক থেকেও করা যায়— টিকা না নিলে স্বাস্থ্য বিভাগও কি দায় সেরে বসে থাকবে? জেলা পরিষদ সদস্য খামলাই ম্রো সরাসরি বলছেন, টিকা নিয়ে ম্রোদের সংস্কার আছে— এটা সত্যি। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগেরও গাফিলতি আছে। টিকা না দিলে তারা আর কিছু করে না। এই মনোভাবটাই বিপজ্জনক।
মারা যাওয়া তিন শিশু হলো রিংলত পাড়ার তিন মাস বয়সী জংরুং ম্রো, সাত বছরের খতং ম্রো এবং আবাসিক হোস্টেলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তুমমুম ম্রো। প্রথম দুজন মারা যান ১২ এপ্রিল, তুমমুম মারা যায় ২২ এপ্রিল হাসপাতালে নিয়ে আসার পথেই।
তবে তিন শিশুর মৃত্যু হামে হয়েছে কিনা— সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জেলা সিভিল সার্জন শাহীন হোসাইন চৌধুরী। তাঁর দাবি, প্রথম দুজনের বয়স এত কম যে হাম হওয়ার কথা নয়, তারা নিউমোনিয়ায় মারা গেছে। তৃতীয়জন হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যাওয়ায় কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কিন্তু মাঠে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবক সাকনাও ম্রো বলছেন ভিন্ন কথা— মৃত দুজনের শরীরে হামের লক্ষণ স্পষ্ট ছিল। নমুনা পরীক্ষা না করেই সিভিল সার্জনের এই দাবি তাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
যারা বাঁচাচ্ছে তারা সরকারি নয়
সরকারি সহায়তার আগেই মাঠে নেমেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশন। সংগঠনের কর্মী মেনতাব ম্রো জানান, রোগীদের বেশির ভাগ অভিভাবকই জুমচাষি, হাতে টাকা নেই। ওষুধ কেনা, হাসপাতালে ভর্তি, কাপড় ও খাবারের ব্যবস্থা— সব করতে হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবকদেরই। এভাবে কাজ করতে গিয়ে কেউ কেউ নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
দেরিতে হলেও মাঠে স্বাস্থ্য বিভাগ
তিন শিশুর মৃত্যুর পর নড়েচড়ে বসেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। শনিবার থেকে কুরুকপাতা বাজারে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প বসানো হয়েছে। রোববার বিকাল পর্যন্ত ৪০০ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনজুর আলম স্বীকার করেন, দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা হেঁটে ছোট শিশুদের টিকা কেন্দ্রে আনা অসম্ভব। টিকা কর্মীদের পাড়ায় পাড়ায় পাঠানো ছাড়া বিকল্প নেই। কিন্তু এই সহজ সমাধানটি বছরের পর বছর কেন হয়নি— সেই প্রশ্নের জবাব কেউ দিচ্ছেন না।


