পাহাড়ের হাল্লোং, ফুর বারেং, দুলো — এই নামগুলো এখন অনেকেই চেনেন না। চাকমা সম্প্রদায়ের শতবছরের পুরনো এই কারুপণ্য এখন বিলুপ্তির পথে। স্টিল আর প্লাস্টিকের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের এই অকৃত্রিম সম্পদ। তবু হাল ছাড়েননি রাঙামাটির লাকি চাকমা। একা লড়ে যাচ্ছেন এই হারানো ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে।
লাকির বাড়িতে গেলে চোখে পড়ে অদ্ভুত এক দৃশ্য। এক কোণে স্তূপ করা বাঁশ। আরেক কোণে অর্ধেক বোনা ঝুড়ি। পাশে বসে কাজ করছেন কারিগররা। হাতের নিপুণ কাজে একটু একটু করে তৈরি হচ্ছে পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী পণ্য।
২০১৬ সালে বিসিক থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করেছিলেন লাকি। লক্ষ্য ছিল একটাই — যে ঐতিহ্য শুধু বৈসু, সাংগ্রাই বা বিজুর মতো উৎসবের দিনে বের হয়, তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে দৈনন্দিন জীবনে। লাকির হাত ধরে আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে চাকমাদের সরল নকশার বাসনপত্র, মারমাদের শৈল্পিক কারুকাজ আর ম্রোদের প্রকৃতিঘেঁষা বুননশৈলী।
রান্নার পাত্র থেকে ফসল তোলার ঝুড়ি, মাছ ধরার ফাঁদ, ঘর সাজানোর আসবাব — সবই তৈরি হয় বাঁশ আর বেত দিয়ে। হাল্লোং, ফুর বারেং, দুলো, হুরুম, লুই, সাম্মো, পেরাবা আর মেজাং — এই নামগুলো শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে দুর্গম পাহাড়ের সহজ-সরল জীবনধারা। ওজনে হালকা, কিন্তু স্থায়িত্বে কয়েক দশকের গ্যারান্টি।

তবে পথ মসৃণ নয়। লাকির এই উদ্যোগ পাহাড়ের শত শত নারীর কর্মসংস্থানের ঠিকানা হতে পারত। পাহাড়ের নারীরা সহজাতভাবে বাঁশ ও বেতের কাজে পারদর্শী। প্রচুর ধৈর্য আর মমতা দিয়ে একেকটি ঝুড়ি বা ডালা তৈরি করেন তাঁরা। কিন্তু এখন মাত্র পাঁচজন কারিগর নিয়ে কাজ চলছে। তার মধ্যে নিয়মিত মাত্র তিনজন। পুরনো কারিগররা বয়সের ভারে থেমে গেছেন। নতুনরা আসতে চান না। কারণ একটাই — রোজগার কম।
বন উজাড় হওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে। বিশেষ জাতের বাঁশ, যা দিয়ে এসব পণ্য তৈরি হয়, সেগুলো এখন প্রায় মেলে না।
সাবাংগী নারী উদ্যোক্তা সমিতির সভানেত্রী ত্রিশিলা চাকমা ও উন্নয়নকর্মী নুকু চাকমা বলছেন, শুধু আবেগ দিয়ে এই শিল্প টিকবে না। দরকার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, বড় পুঁজি আর কারিগরদের উন্নত প্রশিক্ষণ। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাঁশকে দীর্ঘস্থায়ী করা এবং ডিজাইনে বৈচিত্র্য আনতে পারলে এই পণ্য বিশ্ববাজারেও জায়গা করে নিতে পারবে।
সম্ভাবনা আছে। পাহাড়ে আসা পর্যটকেরা এখন প্লাস্টিক ছেড়ে এই টেকসই আর শৈল্পিক পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। পর্যটনশিল্পের বিকাশ পাহাড়ি পণ্য বিক্রির নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু যথাযথ বিপণনব্যবস্থার অভাবে সেই সম্ভাবনা থেকেও যাচ্ছে অধরা।


