Home বিশেষ প্রতিবেদন পাঁচ গোষ্ঠীর চাঁদার রাজত্বে জিম্মি পাহাড়, ট্রাক ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ চাঁদা, বছরে লুট ৭০০ কোটি টাকা

পাঁচ গোষ্ঠীর চাঁদার রাজত্বে জিম্মি পাহাড়, ট্রাক ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ চাঁদা, বছরে লুট ৭০০ কোটি টাকা

রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের ২৬ উপজেলায় পাঁচটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর চাঁদার রাজত্ব। ব্যবসা, পরিবহন, কৃষি, এমনকি জমি বেচাকেনাও বাদ নেই। ভুক্তভোগীরা মুখ খুলতেও ভয় পান — পাহাড়জুড়ে চলছে চাঁদাবাজি'।

পাহাড় সমুদ্র ডেস্ক

প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬, ১১:০৬

Share

খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে ঢাকায় এক ট্রাক কাঠ পাঠাতে ভাড়া লাগে ৫০ হাজার টাকা। পথে পথে চাঁদা দিতে হয় ১ লাখ টাকা — ট্রাক ভাড়ার দ্বিগুণ। রাঙামাটির নানিয়ারচর ও লংগদু সড়কে চিত্র একই। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার ২৬ উপজেলায় ব্যবসায়ী, কৃষক, ঠিকাদার, পরিবহন, বোট-ট্রলার থেকে শুরু করে জমি বেচাকেনা পর্যন্ত — কেউই চাঁদার বাইরে নেই। পাঁচটি সশস্ত্র গোষ্ঠী মাসিক, ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে স্লিপ-টোকেন দিয়ে প্রতি বছর হাতিয়ে নিচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা।

১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির আগে পাহাড়ে মাত্র একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী চাঁদা আদায় করত। চুক্তির পর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচটিতে। এই সময়ের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে তিন জেলায় বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ, অপহৃত হয়েছেন ২ হাজার ১১৮ জন।

“চাহিদা অনুযায়ী চাঁদা না দিলে ঠিকাদারের শ্রমিক অপহৃত হয়, বাগানমালিকের বাগান ধ্বংস হয়, পরিবহনের গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এসব প্রশাসনকে জানাই না — হিতে বিপরীত হওয়ার ভয় থাকে।” — নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঠিকাদার

খাগড়াছড়ি জেলা ও দায়রা জজ কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মঞ্জুর মোর্শেদ ভূঁইয়া বলেন, ব্যবসায়ী, কৃষক, চাকরিজীবী — সবাইকে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা পরিশোধ করতে হয়। নিয়মিত স্পট, মাসিক, ষাণ্মাসিক ও বার্ষিক — সব ভিত্তিতেই চাঁদা আদায় চলে।

কারা নিয়ন্ত্রণ করছে এই চাঁদার জাল?

পাহাড়ে বর্তমানে সক্রিয় গোষ্ঠীগুলো হলো — জেএসএস (সশস্ত্র), ইউপিডিএফ, জেএসএস (সংস্কার), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এবং বান্দরবানে কেএনএফ ও মগ বাহিনী। এই গোষ্ঠীগুলো কালেকটর ও সাবকালেকটর বসিয়ে একটি সমান্তরাল রাজস্ব নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে।

শুধু সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়, সরকারি চারটি প্রতিষ্ঠানের নামেও টোল আদায় হচ্ছে — জেলা পরিষদের বাজার ফান্ড, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং জেলা পরিষদ। এর বাইরে ভুঁইফোড় সংগঠনের নামেও চলছে অর্থ আদায়।

খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, “পাহাড়ে চাঁদাবাজি এত বেশি যে এগুলো রুখে দেওয়া দায়।” প্রান্তিক চাষিদের থেকে বারবার টোল আদায়ের বিষয়ে খোঁজ নেবেন বলেও জানান তিনি।

পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত

চাঁদার দাপটে গত বছর খাগড়াছড়ির পাঁচটি উপজেলায় সরকারি খাদ্য সরবরাহ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

বাংলাদেশ খাদ্য পরিবহন সমিতির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সদস্য ধনা বাবু বলেন, রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে চাঁদা আদায়, ইনভয়েসসহ কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়া এবং চালকদের মারধরের কারণে খাদ্য সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। কাপ্তাই লেকের জেলেরাও গত বছর বর্ধিত চাঁদার চাপ সামলাতে না পেরে মাছ ধরা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

উন্নয়নও থমকে গেছে

চাঁদার থাবা পড়েছে সরকারি উন্নয়নকাজেও। গত ফেব্রুয়ারিতে নানিয়ারচর-লংগদু সড়ক নির্মাণে চাঁদা না পেয়ে সন্ত্রাসীরা এক্সকাভেটরের ইঞ্জিনে বালু ও চিনি মিশিয়ে সেটি নষ্ট করে দেয়। কাউখালী ও লামায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর কাজ বন্ধ রয়েছে।

“পার্বত্য চট্টগ্রামে চার-পাঁচটি গ্রুপের চাঁদাবাজি বেপরোয়া। কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। পাহাড়েরাড়ের সাধারণ মানুষ থেকে কেউই রেহাই পাচ্ছে না।”

— মো. হাবিব আজম, রাঙামাটি জেলা পরিষদ সদস্য

রাঙামাটির পুলিশ সুপার মো. আবদুর রকিব বলেন, সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে এবং চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তবে পাহাড়ের ভৌগোলিক কারণে অভিযান পরিচালনা কঠিন বলেও স্বীকার করেন তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মুখপাত্র ও সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার দাবি করেন, তাঁর দল এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নেই। টেলিফোনে এর বেশি কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।

সর্বশেষ :

আরও পড়ুন: