পাম্পের সামনে লম্বা লাইন, কিন্তু তেল নেই। ‘স্টক আউট’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে একের পর এক ফিলিং স্টেশনে। মোটরসাইকেল নিয়ে আসা মানুষ খালি হাতে ফিরছেন, ট্রাকচালক বসে আছেন রাস্তার ধারে। পার্বত্য জেলা বান্দরবানে এখন এটাই রোজকার ছবি।
গত কয়েকদিন ধরে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে এই পাহাড়ি জেলার জনজীবন। শুধু পরিবহন নয়, এর ঢেউ এসে লাগছে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে নিত্যদিনের বাজারেও। সাধারণ মানুষের মুখে এখন একটাই প্রশ্ন — কতদিন চলবে এই দুর্ভোগ?
সাত পাম্প, পাঁচ উপজেলায় কিছুই নেই
বান্দরবান সদর ও লামা উপজেলা মিলিয়ে মাত্র সাতটি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। সেগুলোতেও সীমিত পরিমাণে অকটেন ও ডিজেল মিলছে — পেট্রল কার্যত নেই বললেই চলে। অনেক পাম্পে গ্রাহকরা এসে শুধু ফিরেই যাচ্ছেন, কারণ বরাদ্দ শেষ।
আর বাকি পাঁচটি উপজেলায় তো ফিলিং স্টেশনই নেই। সেখানকার মানুষ পুরোপুরি নির্ভরশীল খুচরা বিক্রেতাদের উপর। তারাও এখন হাত গুটিয়ে বসে আছে — সরবরাহ না থাকায় বিক্রির কিছু নেই। গত ১৫ দিন ধরে উপজেলা পর্যায়ে অকটেনের দোকান বন্ধ। পাহাড়ের দুর্গম প্রান্তে এর প্রভাব আরও গভীর।
রাস্তায় যান কম, বাজারে চাপ বেশি
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন পরিবহন খাতের মানুষ। মোটরসাইকেলচালক থেকে শুরু করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ট্রাক ও বাসচালক — সবাই তেলের খোঁজে ঘুরছেন এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে। দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল কমে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনেও টান পড়েছে মারাত্মকভাবে।
পাহাড়ি জেলায় যোগাযোগ ব্যবস্থা এমনিতেই দুর্বল। তার উপর জ্বালানি সংকট যুক্ত হওয়ায় প্রত্যন্ত এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। বাজারে ইতিমধ্যেই অস্থিরতার আভাস মিলছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দাম বাড়বেই — আর সেই চাপ শেষমেশ গিয়ে পড়বে সাধারণ ভোক্তার ঘাড়ে। ইতিমধ্যে কিছু পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে বলেও জানা যাচ্ছে।
সংসদ সদস্য ছুটলেন পাম্পে
পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে গত ২৭ মার্চ বান্দরবানের স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরি নিজেই ছুটে যান একটি ফিলিং স্টেশনে। খবর পেয়েছিলেন, পাহাড়ি ফিলিং স্টেশনে কিছুটা অকটেন মজুত আছে। সেখানে গিয়ে তিনি নিজে উদ্যোগ নিয়ে সেই তেল গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করেন।
তবে এটি সাময়িক সমাধান মাত্র। একজন জনপ্রতিনিধির পাম্পে ছুটে যাওয়ার ঘটনাই বরং বলে দিচ্ছে — সংকট কতটা তীব্র আকার নিয়েছে।
কেন এই সংকট?
পাহাড়ি ফিলিং স্টেশনের মালিক নিখিল কান্তি দাশ জানান, ঈদের পর বান্দরবানে পর্যটকের ঢল নেমেছে। তাদের যানবাহনে তেল দিতে গিয়ে স্থানীয় চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পর্যটনের চাপ সামলাতে গিয়ে এবার বিপদে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারাই।
তবে প্রশ্ন উঠছে — কেবল পর্যটকের চাপেই কি এতটা সংকট, নাকি সরবরাহ শৃঙ্খলে আরও গভীর কোনো গলদ রয়েছে? জেলা প্রশাসন বা জ্বালানি বিভাগের তরফ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।
স্থানীয়রা বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে — এবং সেই ক্ষতির ভার বহন করতে হবে পাহাড়ের সাধারণ মানুষকেই।


