শীতের তিন মাস বান্দরবানের হোটেল-রিসোর্টে একটি খালি কক্ষও মেলেনি। পর্যটকের ঢলে রাস্তা গমগম করেছে, চাঁদের গাড়ির চাকা থামেনি এক মুহূর্তও। রমজানে সেই ভিড় কমলেও ঈদুল ফিতরের ছুটিতে আবার লোকারণ্য হয়েছে পর্যটনকেন্দ্রগুলো। সেই উৎসবও এখন থিতু। পাহাড় এখন নিরিবিলি। কিন্তু হোটেল-রিসোর্টের মালিকেরা বসে নেই — রঙের বালতি আর মিস্ত্রির হাতুড়ির শব্দে সরগরম পাহাড়কন্যার অলিগলি। পরের মৌসুম সামনে রেখে পুরো বান্দরবান এখন নতুন করে সাজছে।
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে মেঘের আনাগোনা, সবুজের বুক চিরে বয়ে চলা সাঙ্গু নদী — প্রকৃতি যেন আপন হাতে সাজিয়ে রেখেছে এই পাহাড়কন্যাকে। সেই সৌন্দর্যের টানে প্রতি শীতেই দেশি-বিদেশি পর্যটকে মুখরিত হয় বান্দরবান।
গত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি — এই তিন মাস জেলার শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টে ব্যবসা ছিল তুঙ্গে। পর্যটকবাহী চাঁদের গাড়ি থেকে রেস্তোরাঁ, সব জায়গায় ছিল উৎসবের আমেজ।
রমজানে পর্যটকের ভিড় কমতেই ব্যবসায়ীরা সেই সময়কে কাজে লাগালেন সংস্কার আর রক্ষণাবেক্ষণে। কোথাও দেওয়ালে নতুন রঙের প্রলেপ, কোথাও যুক্ত হলো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। ঈদুল ফিতরের ছুটিতে সেই প্রস্তুতি কাজে এল — পর্যটকে ভরে গেল পাহাড়। এখন ঈদের উৎসব শেষ, ভিড় কমেছে। পরের মৌসুমের আগে আবার চলছে ঘর গোছানোর পালা।
বান্দরবান হোটেল-মোটেল রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন মনে করেন, দুই ঈদের মধ্যবর্তী সময়টায় ভালো ব্যবসার সুযোগ রয়েছে। হলিডে ইন ও ইকোসেন্স রিসোর্টের মালিক জাকির হোসেনও একই সুরে বলেন, রমজানের বিরতিকে কাজে লাগিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, ঈদের ছুটিতে আসা পর্যটকদের ভালো সেবা দেওয়া গেছে।
তবে সম্ভাবনার এই উজ্জ্বল ছবির আড়ালে কিছু অস্বস্তির কথাও বলছেন এই উদ্যোক্তারা। জাকির হোসেনের মতে, বিশ্বজুড়ে পর্যটন এখন বড় অর্থনীতির চাবিকাঠি, কিন্তু বাংলাদেশ সেই সুযোগ এখনো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতা বাড়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন কিছুটা চাপে পড়ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদেশি পর্যটক টানতে না পারার পেছনে দুটো বড় কারণ — আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব আর জটিল ভিসানীতি।
এই সংকট কাটাতে নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে আছেন পাহাড়ের মানুষ। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরি জানিয়েছেন, পর্যটন খাতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হবে। পার্বত্য পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রেখে আন্তর্জাতিক মানের হোমস্টে ও ইকো-রিসোর্ট গড়ে উঠলে স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নত হবে, আর পাহাড়ের হস্তশিল্প, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও সংস্কৃতি পৌঁছে যাবে বিশ্বদরবারে।


