Home বিশেষ প্রতিবেদন পাহাড়ের ‘রসকো’ এখন আপেলের চেয়েও দামি!

পাহাড়ের ‘রসকো’ এখন আপেলের চেয়েও দামি!

লাল রসে টইটম্বুর এই বুনোফলের নাম রসকো। পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীন জঙ্গল থেকে নেমে এসে এখন সে জায়গা করে নিয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রামের বাজারেও। দাম? বিদেশি আপেলকেও টেক্কা দিচ্ছে এই দেশীয় বুনোফল।

পাহাড় সমুদ্র ডেস্ক

প্রকাশ : ৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৭

Share

ভেতরটা যেন কেউ রক্তে ভরে রেখেছে। কামড় দিলেই গাঢ় লাল রস। স্বাদে টক, একটু মিষ্টি। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ এই ফল চেনেন ছোটবেলা থেকেই — কেউ বলেন রসকো, কেউ বলেন রক্তফল, কেউ বা রক্তগোটা। কিন্তু এখন সেই চেনা বুনোফলই হয়ে উঠেছে বাজারের ‘ভিআইপি’। প্রতি কেজির দাম উঠেছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় — যেখানে বিদেশ থেকে আমদানি করা আপেল মিলছে মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়!

রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি আর বান্দরবানের গহীন বনে বড় গাছকে আঁকড়ে বেড়ে ওঠে রসকোর লতা। মার্চ থেকে মে — এই তিন মাসই তার মৌসুম। থোকা থোকা ধরে, পাকলে হয় টকটকে লাল বা সিঁদুরে রঙের। চাকমা ভাষায় ‘রসকো’, ত্রিপুরাদের কাছে ‘তাইথাক’, মারমাদের কাছে ‘লস্কর’ — তিন জনগোষ্ঠীর তিন নাম, কিন্তু ভালোবাসা এক।

পাকা ফল এমনিই খাওয়া যায়। অনেকে বানান ভর্তা, কেউ বা জ্যাম। কিন্তু এই ফলের সবচেয়ে বড় ‘ম্যাজিক’ লুকিয়ে আছে তার ভেতরের রক্তলাল রসে।

বনরুপা বাজারের বিক্রেতা সুবল চাকমা জানালেন, ফলের ভেতরটা রক্তের মতো লাল রসে ভরা। এটা খেলে রক্তস্বল্পতা দূর হয়। তাই অনেকেই আগ্রহ করে কেনেন।

শুধু বিক্রেতার কথা নয়, কৃষি বিশেষজ্ঞরাও এই ফলের গুণের কথা স্বীকার করেন। রাঙ্গামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান জানাচ্ছেন, রসকোয় আছে ফাইবার, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি এবং ভিটামিন বি-৬। পাহাড়িরা এই লতা জন্ডিস ও চুলকানির ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার করেন দীর্ঘকাল ধরে।

আগে দাম ছিল না, এখন সোনার চেয়ে দামি
সুবল চাকমা একটু আক্ষেপের সুরেই বললেন, আগে পাহাড়ের বনে-জঙ্গলে প্রচুর হতো। তখন তেমন দাম ছিল না। এখন গাছ আর বেশি দেখা যায় না। দামও অনেক বেড়ে গেছে।” মৌসুমের শুরুতে তিনি ৫০০ টাকা কেজিতে বেচেছেন, এখন ৪০০ টাকায় নেমেছেন।

রাঙ্গামাটি শহরের বনরুপা, রাজবাড়ী, কল্যাণপুর, কলেজগেট, তবলছড়ি বাজারে নিয়মিত দেখা মিলছে এই ফলের। বুধ ও শনিবারের সাপ্তাহিক হাটে তো ভিড় আরও বেশি।

এই ফলের চাহিদা দেখে অনেক পাহাড়ি কৃষকই এখন বাণিজ্যিক চাষের স্বপ্ন দেখছেন। নানিয়ারচরের সুব্রত বিকাশ চাকমা বাড়ির পাশে রসকোর লতা লাগিয়েছিলেন ১৮ বছর আগে। এখন পর্যন্ত সেই একটি লতা থেকেই বিক্রি হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ফল।
রাঙ্গামাটি সদরের লক্ষ্মী কুমার চাকমার গল্পটা আরও চমকপ্রদ। ১৫ বছর ধরে তাঁর একটি রসকো লতা ফলন দিয়ে আসছে। এ বছর শুধু ওই একটি লতা থেকেই তিনি আশা করছেন ৭০ হাজার টাকার বিক্রি!

তবে রসকো চাষে একটু ধৈর্য চাই। লক্ষ্মী কুমার জানালেন, বীজ থেকে ফল পেতে অপেক্ষা করতে হয় ছয় থেকে সাত বছর। আর এই লতার চাই একটি বড়, দীর্ঘস্থায়ী গাছের আশ্রয় — আম গাছে নাকি সবচেয়ে ভালো বাড়ে।

কৃষি কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান স্বীকার করলেন, এই ফল নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক গবেষণা হয়নি। তবু তিনি আশাবাদী। পার্বত্য চট্টগ্রামের আবহাওয়া রসকো চাষের জন্য একেবারে আদর্শ। বাণিজ্যিকভাবে চাষ হলে কৃষকরা লাভবান হবেন — এতে তাঁর সন্দেহ নেই।

সর্বশেষ :

আরও পড়ুন: