Home কক্সবাজার ৪৫ দিনের গ্যাস ২০ দিনেই শেষ, বাকি দিনগুলোয় বন কাটছেন ১৪ লাখ রোহিঙ্গা

৪৫ দিনের গ্যাস ২০ দিনেই শেষ, বাকি দিনগুলোয় বন কাটছেন ১৪ লাখ রোহিঙ্গা

মাসে একবার গ্যাস মিলত, এখন মেলে ৪৫ দিনে একবার। সেই গ্যাসও শেষ হয়ে যায় ২০ দিনেই। বাকি দিনগুলোয় ভরসা সংরক্ষিত বনাঞ্চল। উখিয়া-টেকনাফের ১৪ লাখ রোহিঙ্গা প্রতি মাসে পুড়িয়ে ফেলছেন সাত লাখ মণ কাঠ। বন বিভাগ বলছে, জুনের মধ্যে এই বনে গাছ বলে কিছু থাকবে না।

পাহাড় সমুদ্র ডেস্ক

প্রকাশ : ৫ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২৯

Share

মাসে একবার গ্যাস মিলত, এখন মেলে ৪৫ দিনে একবার। সেই গ্যাসও শেষ হয়ে যায় ২০ দিনেই। বাকি দিনগুলোয় ভরসা সংরক্ষিত বনাঞ্চল। উখিয়া-টেকনাফের ১৪ লাখ রোহিঙ্গা প্রতি মাসে পুড়িয়ে ফেলছেন সাত লাখ মণ কাঠ। বন বিভাগ বলছে, জুনের মধ্যে এই বনে গাছ বলে কিছু থাকবে না।

ত্রিপলের ছাউনির ছোট্ট ঘর। স্ত্রী আর চার সন্তান নিয়ে থাকেন কাদির হোসেন। একটাই ভরসা ছিল — জাতিসংঘের দেওয়া ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডার। কিন্তু সেই সিলিন্ডার এখন আসে ৪৫ দিনে একবার। আর তা দিয়ে চলে মাত্র ২০ দিন। বাকি দিনগুলোয়? বাধ্য হয়ে কাঠ কুড়াতে ঢুকতে হয় সংরক্ষিত বনে।

কক্সবাজারের উখিয়ার মধুরছড়া আশ্রয়শিবিরের এই বাসিন্দার গল্পটা আসলে ১৪ লাখ রোহিঙ্গার গল্প। চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এভাবেই চলছে উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরের ২ লাখ ৪৫ হাজার পরিবারের দিনযাপন।

লম্বাশিয়া ও বালুখালী আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা নুরুল আলম, রহিম উল্লাহ ও সুলতান আহমদ জানালেন, ৪৫ দিনের জন্য দেওয়া ১২ কেজির সিলিন্ডার ১৫ থেকে ২০ দিনের বেশি চলে না। বাজারে একটি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার টাকার বেশি। সেটি কেনার সামর্থ্য নেই। খাদ্যসহায়তাও কমে গেছে। আগে মাসে ১২ ডলার পেতেন, এখন পান ৭ থেকে ১২ ডলার।

হিসাবটা ভয়াবহ। প্রতিটি পরিবারের দিনে দরকার পাঁচ কেজি কাঠ। ২০ দিনের জন্য লাগে ১০০ কেজি। আর ২ লাখ ৪৫ হাজার পরিবারের হিসাবে প্রতি মাসে দরকার প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ কেজি — অর্থাৎ ৬ লাখ ১২ হাজার ৫০০ মণ কাঠ। এর পুরোটাই যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন বলছেন, পাহারা বসিয়েও বন রক্ষা করা যাচ্ছে না। ২০১৭ সালের আগে উখিয়া-টেকনাফে প্রায় ১০ হাজার একর বনায়ন হয়েছিল। আশ্রয়শিবির নির্মাণেই তা নষ্ট হয়। পরে নতুন করে সাত হাজার একরে বনায়ন হলেও জ্বালানি কাঠের চাপে এখন সেগুলোও বিপন্ন। বনভূমি ধ্বংসে হাতির করিডর বন্ধ হয়ে গেছে, আবাসস্থল ও জলাশয় নষ্ট হয়েছে। ৬৭টি বন্য হাতি এখন খাদ্য ও পানির সংকটে। গত আট বছরে হাতির আক্রমণে মারা গেছেন ১৩ জন, আহত হয়েছেন শতাধিক।

পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা সাফ বলছেন, জুনের মধ্যে এই অবস্থা না বদলালে উখিয়া-টেকনাফের সংরক্ষিত বনে গাছ বলে কিছু অবশিষ্ট থাকবে না।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান স্বীকার করছেন, তহবিলসংকটের কারণেই মাসিক সিলিন্ডার এখন ৪৫ দিনে একবার দেওয়া হচ্ছে। এতে ১০ থেকে ১৫ দিনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। সেই ঘাটতি পূরণ হচ্ছে বন থেকে।

ইউএনএইচসিআর জানাচ্ছে, ২০১৮ সালে চালু হওয়া এলপিজি কর্মসূচির কারণে গত সাত বছর বন উজাড় ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমেছিল। আশ্রয়শিবিরের বেশিরভাগ ঘর বাঁশ ও দাহ্য উপকরণে তৈরি — আগুন লাগলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। জ্বালানি কাঠে ফিরে গেলে বহু বছরের বনায়ন প্রচেষ্টা ধুলোয় মিলিয়ে যাবে, বাড়বে শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ঝুঁকিতে পড়বেন নারী ও শিশুরা।

গ্যাস সিলিন্ডারের অভাবে একদিকে বন উজাড় হচ্ছে, অন্যদিকে বিপন্ন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। মাঝখানে ১৪ লাখ মানুষ — না পাচ্ছেন পর্যাপ্ত গ্যাস, না পারছেন অন্য কোনো পথ খুঁজতে।

সর্বশেষ :

আরও পড়ুন: