0
পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে এখন উৎসবের আমেজ। পুরোনো বছরের সব দুঃখ, জরা আর গ্লানিকে হ্রদের জলে বিসর্জন দিয়ে নতুন ভোরের প্রত্যাশায় মাতোয়ারা পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা। রবিবার (১২ এপ্রিল) ভোরে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জলে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে পাহাড়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা।
চাকমা জনগোষ্ঠীর কাছে এটি ‘ফুল বিজু’, ত্রিপুরাদের কাছে ‘হাঁড়িবসু’ আর মারমা সম্প্রদায়ের কাছে ‘সূচিকাজ’ নামে পরিচিত। ভিন্ন ভিন্ন নামে পালন করা হলেও পাহাড়ের ১২টি জাতিগোষ্ঠীর মানুষের আবেগ আর প্রার্থনা আজ মিশে গিয়েছিল কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশিতে।
রোববার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই রাঙ্গামাটি শহরের রাজবনবিহার ঘাট, গর্জনতলী মধ্যদ্বীপ ও কেরাণী পাহাড়সহ বিভিন্ন স্থানে মানুষের ঢল নামে। রঙিন পোশাকে সজ্জিত পাহাড়ি তরুণ-তরুণী ও শিশুরা নানান রঙের ফুল আর নিমপাতা নিয়ে সমবেত হন হ্রদের পাড়ে। কলাপাতা ভরে পবিত্র এই ফুল হ্রদের জলে ভাসিয়ে দিয়ে তারা আগামীর সুখ ও সমৃদ্ধির জন্য গঙ্গা দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন।
উৎসবের প্রথম দিনটি মূলত প্রকৃতি ও জলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর দিন। ফুল ভাসাতে আসা মিত্র চাকমা বলেন, আমরা একে ফুল নিবেদন বলি। জল বা পানির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই গঙ্গাদেবী ও জলবুদ্ধের কাছে এই প্রার্থনা। আমাদের চাওয়া, সারা বছর যেন সবাই ভালো থাকে।
আরেকজন অংশগ্রহণকারী জোনাকি চাকমা জানান, ফুল ভাসানোর মাধ্যমেই মূলত বর্ষবরণের মূল আমেজ শুরু হয়। আজ ফুল বিজু, সোমবার মূল বিজু এবং মঙ্গলবার বছরের প্রথম দিন বা গজ্জ্যেপজ্জ্যে দিন, এই তিন দিন পাহাড়ে আনন্দের কোনো সীমা থাকে না।
পাহাড়ের এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব এখন আর কেবল নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীর গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি রূপ নিয়েছে পাহাড়ের সব মানুষের এক মিলনমেলায়। উৎসব উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ইন্টু মনি তালুকদার বলেন, এই ফুল ভাসানো এখন কেবল রীতি নয়, এটি একটি সম্প্রীতির উৎসবে পরিণত হয়েছে। পাহাড়ের সব জাতিসত্ত্বার মানুষ আজ একসঙ্গে মিলিত হয়ে প্রার্থনা করছে যাতে আগামী দিনগুলোতে সবাই মিলেমিশে সুখ-শান্তিতে বসবাস করতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা ভিন্ন ভিন্ন নামে এই উৎসব পালন করে থাকে। চাকমারা ‘বিজু’, ত্রিপুরারা ‘বৈসুক’, মারমারা ‘সাংগ্রাই’, তঞ্চঙ্গ্যারা ‘বিষু’ এবং অহমিয়ারা ‘বিহু’ নামে এই উৎসব উদযাপন করেন। আজ উৎসবের প্রথম দিনে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা এবং দরজায় ফুল ও নিমপাতা টাঙানোর মাধ্যমে অশুভ শক্তিকে দূরে রাখার চিরাচরিত নিয়ম পালন করা হচ্ছে।
আজকের এই আনন্দঘন সূচনার পর পালিত হবে উৎসবের মূল দিন। পাহাড়ের প্রতিটি ঘরে ঘরে চলবে অতিথি আপ্যায়ন আর ঐতিহ্যবাহী ‘পাজন’ রান্নার আয়োজন। সব মিলিয়ে ফুল বিজুর স্নিগ্ধতায় এখন নতুন বছরের অপেক্ষায় মুখর পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম।


