চার দিন ধরে গাদাগাদি করে বসে আছেন তিনশোর বেশি মানুষ। অক্সিজেন নেই। বাতাস নেই। মাছ রাখার ছোট্ট গুদামে বন্দী নারী, শিশু, বৃদ্ধ। বাইরে উত্তাল আন্দামান সাগর। আর ভেতরে একে একে মরছে মানুষ। এই নরক থেকে বেঁচে ফিরেছেন রোহিঙ্গা রফিকুল ইসলাম। তাঁর বয়ানে উঠে এল এক অকল্পনীয় বিভীষিকার ছবি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রফিকুল জানান, গত ৪ এপ্রিল টেকনাফ উপকূল থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হন তাঁরা। প্রথমে ছোট মাছ ধরার নৌকায়, পরে মিয়ানমারের জলসীমার কাছে পাচারকারীরা তাঁদের একটি বড় ট্রলারে তুলে দেয়। সেই ট্রলারে ছিলেন প্রায় তিনশো জন — নারী, শিশু আর সন্দেহভাজন পাচারকারী মিলিয়ে।
নৌবাহিনীর টহল এড়াতে পাচারকারীরা সবাইকে মাছ ও জাল রাখার গুদামে ঠেসে দেয়। সেখানে অক্সিজেনের তীব্র অভাব। রফিকুলের ভাষায়, ‘ট্রলার উল্টে যাওয়ার আগেই ওই গুদামে শ্বাসরোধ হয়ে অন্তত ৩০ জন মারা যায়। আমরা নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। যখন ট্রলারটি উল্টে যায়, তখন শত শত মানুষ সমুদ্রে পড়ে যায়।’
এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে উত্তাল সমুদ্র, তীব্র বাতাস আর অতিরিক্ত যাত্রীর ভারে ট্রলারটি ডুবে যায়। পরে বাংলাদেশের পতাকাবাহী একটি তেলের জাহাজ রফিকুলসহ মোট ৯ জনকে উদ্ধার করে। বাকি প্রায় আড়াইশো জন এখনো নিখোঁজ।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
রফিকুলের এই যাত্রা আসলে লাখো রোহিঙ্গার অসহায়ত্বেরই প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোতে এখন প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রিত। খাদ্য বরাদ্দ নেমে এসেছে মাসে মাত্র ৭ ডলারে। ৬৯ শতাংশ পরিবারের শিশুরা স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে। আর মাত্র ২ শতাংশ রোহিঙ্গা অভিভাবক সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী — যেখানে স্থানীয় বাংলাদেশিদের মধ্যে এই হার ৮৪ শতাংশ।
এই হতাশার কারণেই বারবার বিপজ্জনক সমুদ্রপথে জীবন বাজি রাখছেন রোহিঙ্গারা। ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি সতর্ক করেছে, টেকসই সহায়তা না পেলে এই মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হবে।


