রোহিঙ্গা সংকট আর আরাকান আর্মির দাপটে টেকনাফ বন্দর বন্ধ, সীমান্ত বাণিজ্য স্থবির। তবু হাল ছাড়তে নারাজ বাংলাদেশ-মিয়ানমার চেম্বার অব কমার্সের (বিএমসিসি) ভাইস প্রেসিডেন্ট শিহাব উদ্দিন আহমদ। দুই দশক ধরে মিয়ানমারে বসবাসরত এই বিশেষজ্ঞের স্পষ্ট বক্তব্য — রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে বাণিজ্যিক সম্পর্ক। কূটনীতি যেখানে বারবার ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে ব্যবসার সেতু দুই দেশের মানুষের মধ্যে আস্থা ফেরাতে পারে — আর সেই আস্থাই খুলে দিতে পারে প্রত্যাবাসনের দরজা।
২০১৭ সালের রোহিঙ্গা গণহত্যার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে। তার ওপর ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর রাখাইন অঞ্চলে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ বাড়তে থাকে। মিয়ানমার সরকারের প্রশাসনিক উপস্থিতি সেখানে এখন কার্যত শূন্য। এই অস্থিতিশীলতার সরাসরি শিকার টেকনাফ স্থলবন্দর — ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে যা পুরোপুরি বন্ধ।
শিহাব উদ্দিন বলেন, রাখাইনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণের কারণে সীমান্তভিত্তিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক সমন্বয় এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তবে এটাই চূড়ান্ত চিত্র নয় — ইয়াঙ্গুন সমুদ্রবন্দরসহ বিকল্প পথে সীমিত আকারে বাণিজ্য এখনও চলছে।
রোহিঙ্গা প্রশ্নে শিহাব উদ্দিনের বিশ্লেষণ একটু ভিন্ন পথে হাঁটে। তাঁর মতে, বাংলাদেশে মিয়ানমারকে কেবল রোহিঙ্গা সমস্যার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, আর মিয়ানমারে বাংলাদেশকে দেখা হয় রোহিঙ্গাদের উৎস হিসেবে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙতে না পারলে প্রত্যাবাসন কখনোই বাস্তবে রূপ নেবে না। বাণিজ্যিক সম্পর্ক সেই দেয়াল ভাঙার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।
টেকনাফ বন্ধ থাকলেও বিএমসিসি তিনটি বিকল্প সমুদ্র রুট সক্রিয় করার পরিকল্পনা করছে — ইয়াঙ্গুন, সিত্তে ও দাওয়েই বন্দর থেকে সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দর। শিহাব উদ্দিন মনে করিয়ে দেন, রাখাইন থেকে বাংলাদেশের দূরত্ব মাত্র তিন কিলোমিটার। সেখান থেকে চাল, ডাল, মাছ, গরু-ছাগল সহজেই আনা সম্ভব। ভারতনির্ভর খাদ্য আমদানির ঝুঁকি কমাতেও মিয়ানমার বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে বাংলাদেশও মিয়ানমারে রপ্তানির বড় সুযোগ দেখছেন তিনি। সিমেন্ট, সিরামিক, টেক্সটাইল, ওষুধ — এসব পণ্য মিয়ানমার এখন চীন থেকে আনে, যার পরিবহন খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। বাংলাদেশ কাছের প্রতিবেশী হিসেবে এখানে স্বাভাবিক সুবিধা পাবে। এমনকি মিয়ানমার সংঘাত কাটিয়ে উঠলে বড় পুনর্গঠন শুরু হবে — সেই বাজারেও বাংলাদেশের পণ্যের বিশাল চাহিদা তৈরি হবে। পোশাক খাতেও সুযোগ আছে, কারণ মিয়ানমার এখনও ইউরোপের জিএসপি সুবিধা পাচ্ছে, যা বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে হারাবে। স্বাস্থ্যসেবা খাতেও বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প মিয়ানমারের বাজারে ইতিমধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
আরাকান আর্মির উত্থান আর রোহিঙ্গা সংকটের দ্বৈত চাপের মধ্যেও শিহাব উদ্দিনের বার্তা স্পষ্ট — মিয়ানমারকে শুধু সমস্যা হিসেবে না দেখে সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। বাণিজ্যের সেতু একবার তৈরি হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের যে দরজা বছরের পর বছর বন্ধ, তা খুলতে শুরু করতে পারে।


