সারা দেশে হামের প্রাদুর্ভাব। শিশু রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। চলছে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি। এই সংকটময় মুহূর্তেই দুর্গম পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে নিয়মের তোয়াক্কা না করে একযোগে বদলি করা হলো ৫৪ জন নার্সকে — যাদের অনেকে ছাড়পত্র ছাড়াই কর্মস্থল ছেড়ে চলে গেছেন। আগে থেকেই ৬৯টি পদ শূন্য থাকা এই জেলায় এখন নার্স-শূন্যতা ছুঁতে চলেছে ১২৩-এ। পাহাড়ের প্রসূতি মা থেকে অসুস্থ শিশু — সবার চিকিৎসা এখন অনিশ্চিত।
গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ৫৪ জন নার্সের প্রথম পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল। যোগদানের মাত্র সাত মাসের মাথায়, ১৯ এপ্রিল নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর থেকে তাদের একযোগে বদলির আদেশ জারি হয়। ২৬ এপ্রিলের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় ওই আদেশে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে প্রক্রিয়া নিয়ে। পার্বত্য অঞ্চলে বদলির জন্য নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে আবেদন করে সিভিল সার্জনের সুপারিশসহ পার্বত্য জেলা পরিষদের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। সেই নিয়ম মানা হয়নি।
অভিযোগ উঠেছে, বদলিকৃত অনেক নার্স সরাসরি অনলাইনে আবেদন করে বদলি নিয়েছেন। ছাড়পত্র ছাড়াই দীঘিনালা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দুজন ও জেলা সদর হাসপাতালের একজন নার্স ইতিমধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন — যা সরকারি চাকরি বিধিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ছাড়পত্র দিতে বিভিন্ন মহল থেকে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বদলি কার্যক্রমে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনও উপেক্ষা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই অনিয়মের মাশুল দিতে হচ্ছে পাহাড়ের সাধারণ মানুষকে। জেলায় নার্সের অনুমোদিত ৩৪১টি পদের বিপরীতে এমনিতেই ৬৯টি পদ শূন্য ছিল। ৫৪ জন চলে যাওয়ায় মোট শূন্য পদ দাঁড়াবে ১২৩-এ। শুধু সদর হাসপাতালেই ১৩৫ জন নার্সের বিপরীতে এখন ২০টি পদ ফাঁকা।
পাহাড়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট থাকায় প্রসূতি মা, শিশু ও জরুরি রোগীদের সেবার বড় অংশ নির্ভর করে নার্সদের ওপর। এর মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাবে শিশু রোগীর চাপ বেড়েছে। টিকাদান কর্মসূচিতেও নার্সদের ভূমিকা অপরিহার্য। চিকিৎসকরা বলছেন, এই মুহূর্তে প্রসূতি বিভাগ, জরুরি বিভাগ, ইনজেকশন ও ড্রেসিং — সব ক্ষেত্রেই সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. রিপল বাপ্পী চাকমা বলেন, “নার্সসহ বেশিরভাগ সেক্টরেই জনবল সংকট রয়েছে। নতুন করে বদলি হলে সংকট আরও বাড়বে এবং স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।”
ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. রতন খীসা বলেন, “আগে থেকেই ৬৯টি পদ শূন্য। এখন আরও ৫৪ জনের বদলির আদেশে মোট শূন্যপদ দাঁড়াবে ১২৩-এ। সীমিত জনবল দিয়ে ২৪ ঘণ্টা সেবা চালু রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।”
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “এতগুলো পদ খালি রেখে একসঙ্গে এতজন নার্সের বদলি স্বাস্থ্যসেবায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পুরো বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।”


