মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা আবুল কালাম টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা জমিরা বেগমকে বিয়ে করেন। তারপর শ্বশুরকে ‘বাবা’ আর শাশুড়িকে ‘মা’ সাজিয়ে বানিয়ে নেন ভুয়া বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র। ফলে কাগজে-কলমে স্বামী-স্ত্রী হয়ে উঠলেন আপন ভাইবোন। তবে এতেই থামেননি তিনি। বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ছেলে মোহাম্মদ ফারুকের নামেও তৈরি হয় এনআইডি। সেই এনআইডি দিয়ে পাসপোর্ট বানিয়ে ফারুক পাড়ি জমান মালয়েশিয়া।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একই কায়দায় রোহিঙ্গা কাউছার ক্যাম্পে বসবাস করতে করতে ভুয়া মা-বাবা সাজিয়ে এনআইডি বানিয়েছেন। তারপর জাল পাসপোর্ট নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন আমেরিকায়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল — মাত্র তিন বছরে শুধু টেকনাফ উপজেলায় ১৫ থেকে ২০ হাজার রোহিঙ্গা ভুয়া বাংলাদেশি এনআইডি সংগ্রহ করেছেন। একটি ইউনিয়ন — সাবরাং-এই সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। আর গোটা কক্সবাজার জেলায় এই সংখ্যা ৪ থেকে ৫ লাখ বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান।
যেভাবে চলে এই জালিয়াতি
প্রক্রিয়াটি সাজানো-গোছানো। প্রথমে পুরোনো রোহিঙ্গাদের সহায়তায় নতুনরা ক্যাম্প ছেড়ে সীমান্তবর্তী গ্রামে আশ্রয় নেন। এরপর দালালচক্র ভুয়া ‘মা-বাবা’ জোগাড় করে জন্মনিবন্ধন তৈরি করে। তারপর জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে নির্বাচন অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ভোটার তালিকায় নাম তোলা হয়। ছবি ও আঙুলের ছাপ দেওয়ার সময়ও চলে কারসাজি।
খরচ? একটি এনআইডি তৈরিতে লাগে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা। সেই টাকা ভাগ হয় দালাল, জনপ্রতিনিধি, চৌকিদার, ইউনিয়ন পরিষদ ও নির্বাচন অফিসের কর্মচারীদের মধ্যে। এনআইডি হাতে পেলে পাসপোর্ট বানাতে লাগে আরও ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোহিঙ্গা ভোটার জানান, “দালালচক্রের মাধ্যমে গেলে কোথাও কোনো ঝামেলায় পড়তে হয় না। পুরো প্রক্রিয়ায় আমার প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।”
‘চালের কার্ড করে দেব’ বলে নেওয়া হয় এনআইডি
শাহপরীর দ্বীপের কৃষক ফরিদ আলম মরিচ ক্ষেতে কাজ করছিলেন — জানতেনও না তাঁর নাম ব্যবহার করে রোহিঙ্গা রহিম উল্লাহ একটি এনআইডি বানিয়ে ফেলেছেন। ফরিদ আলম বলেন, “চালের কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে রহিম উল্লাহ আমার এনআইডি নিয়েছিল। সে যে এত বড় জালিয়াতি করবে, তা কখনো ভাবিনি।” রহিম উল্লাহর এনআইডিতে ফরিদ আলম ও তাঁর স্ত্রী মমতাজ বেগমকে মা-বাবা দেখানো হয়েছে — অথচ দম্পতি স্বীকার করেছেন, রহিম উল্লাহ নামে তাদের কোনো সন্তান নেই।
এ ছাড়া অনুসন্ধানে আরও বেশ কয়েকজনের ভুয়া এনআইডির তথ্য পাওয়া গেছে। রোহিঙ্গা সালমা আক্তার, শাহেদুল ইসলাম, আজম উল্লাহ — সবার এনআইডিতে শাহপরীর দ্বীপের ঠিকানা ব্যবহার করে ভুয়া মা-বাবার নাম বসানো হয়েছে। ক্যাম্পে বসে এনআইডি নিয়েছেন মো. উসমান, জোবাইর, আসাদ উল্লাহ, রহমত উল্লাহসহ আরও অনেকে।
বিশেষ অঞ্চল ঘোষণাও কাজে আসেনি
রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে ভোটার হওয়া ঠেকাতে নির্বাচন কমিশন কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৩১ উপজেলাকে বিশেষ অঞ্চল ঘোষণা করেছে। এসব এলাকায় নতুন ভোটার হতে হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ কমিটির যাচাই-বাছাই পেরোতে হয়। কিন্তু এত কড়াকড়ির পরও থামছে না জালিয়াতি।
সাবরাং ইউনিয়নের ইউপি সদস্য রেজাউর করিম রেজু একাধিক রোহিঙ্গার এনআইডির সত্যতা যাচাই করে স্বাক্ষর করেছেন। যদিও তিনি দাবি করেন, “কোনো রোহিঙ্গাকে সহায়তা করার প্রশ্নই আসে না।” তবে একই সঙ্গে স্বীকার করেন, সংঘবদ্ধ চক্র তাদের সিল-স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে এনআইডি বানিয়ে দিচ্ছে।
শাহপরীর দ্বীপের আরেক ইউপি সদস্য আবদুস সালাম ও আবদুল মান্নান জানান, তাদের দুই ওয়ার্ডে এভাবে কয়েকশ রোহিঙ্গা এনআইডি সংগ্রহ করেছেন। অনেককে শনাক্তও করা হয়েছে, ভুয়া এনআইডি বাতিলের প্রস্তুতি চলছে।
দালালচক্রের হোতাদের মধ্যে নাম উঠে এসেছে নুর হাসান (মালয়েশিয়ায় পলাতক), জাদেহ উল্লাহ, মো. ফয়সাল, বেলাল উদ্দিন, মোহাম্মদ রুবেল, রোহিঙ্গা শাহেদুল ইসলাম (বর্তমানে সৌদি আরবে পলাতক) প্রমুখের।
নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, “রোহিঙ্গাদের অবৈধ এনআইডি সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দেশ বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে।” তিনি আরও সতর্ক করেন, বাংলাদেশি পরিচয় পেয়ে যাওয়া এই রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যতে শনাক্ত করা কঠিন হবে — যা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এনআইডি দিয়ে পাসপোর্ট বানিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছেন। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কী বলছে নির্বাচন কার্যালয়
টেকনাফ উপজেলা নির্বাচন অফিস জানিয়েছে, সম্প্রতি হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদে অবৈধভাবে ভোটার হওয়ার চেষ্টার সময় অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গার ফাইল জব্দ করা হয়েছে। সাবরাং ইউনিয়নের শতাধিক এনআইডি তদন্তাধীন এবং কিছু এনআইডি বাতিলের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তবে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা অনীক চৌধুরী একাধিকবার ফোন করলেও বক্তব্য দেননি।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আ. আজিজ বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কেউ জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে গণহত্যার পর ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। তাদের রাখা হয়েছে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার শিবিরে। সেই শিবির থেকেই এখন বাংলাদেশি পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে একটি অংশ ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে।


