পাহাড়ের কোলঘেঁষা জনপদে একটি বাজার মানেই শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়—এটি মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন, সম্পর্কের বন্ধন আর স্বপ্ন বোনার কেন্দ্র। কিন্তু এক ঝলক আগুনই দেখিয়ে দিল কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে এসব পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত বাজার। জুরাছড়ি উপজেলার দুমদুম্যা ইউনিয়নের গবছড়ি বাজারে গত শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে লাগা আগুনে পুড়ে যায় অন্তত ২৬টি দোকান ও ১০টি বসতঘর। মুহূর্তেই থমকে যায় একটি জনপদের জীবনচক্র।
‘আগুনের সামনে আমরা অসহায়’
ঘটনার দিন বাজারে কোনো কার্যকর অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছিল না বলে জানান স্থানীয়রা। দোকানি কালো কেতু বলেন, “আগুন লাগার পর আমরা শুধু পানি ঢালার চেষ্টা করেছি। বাজারে একটা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রও ছিল না। আগুনের সামনে আমরা একেবারেই অসহায়।”
নিত্য লালের কণ্ঠে হতাশা, সাত-আট বছরের সঞ্চয় পুড়ে ছাই। শুরুতেই যদি আগুন নেভানোর ব্যবস্থা থাকত, এত ক্ষতি হতো না।

বিরেজ পুদি চাকমা বলেন, প্রত্যন্ত বাজারে আমরা সব সময় ঝুঁকিতে থাকি। আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস আসতে সময় লাগে। ততক্ষণে সব শেষ।
স্থানীয় বাসিন্দা রতন চাকমার মতে, প্রতিটি পাহাড়ি বাজারে বাধ্যতামূলকভাবে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, পানির ট্যাংক ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক দল থাকতে হবে। না হলে আবারও এমন বিপর্যয় ঘটবে।
পুড়েছে শিক্ষার্থীদের স্বপ্নও
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ২৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী। বই-খাতা, স্কুলব্যাগ—সব পুড়ে যাওয়ায় তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
চুমাচুমি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুনি শংকর চাকমা বলেন, “নতুন বই পুড়ে যাওয়ায় শিশুরা কেঁদেছে। তাদের কাছে বই মানে ভবিষ্যৎ। তবে দ্রুত নতুন বই সরবরাহ করায় তারা আবার স্কুলে ফিরতে পারছে।”

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রান্তিকা চাকমা বলে, সব বই পুড়ে যাওয়ার পর খুব ভয় পেয়েছিলাম। এখন নতুন বই পেয়েছি, আবার পড়তে পারব।

প্রশাসনের আশ্বাস
জুরাছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বায়োজীদ বিন আখন্দ বলেন, “ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শুকনা খাবার ও কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে—পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত বাজারগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।”
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, দুর্গম এলাকায় আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। তাই স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সাময়িক সহায়তা, স্থায়ী সমাধান কোথায়?
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
জুরাছড়ি উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জনপূর্ণ চাকমা বলেন, আমরা ২৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী ও ৪০টি পরিবারের মধ্যে নগদ অর্থ, খাদ্যসামগ্রী ও শিক্ষা উপকরণ দিয়েছি। কিন্তু এটি সাময়িক সহায়তা। দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সমস্যা থেকেই যাবে।
এখনই উদ্যোগ না নিলে ঝুঁকি বাড়বে
গবছড়ি বাজারের ধ্বংসস্তূপ এখন শুধু একটি অগ্নিকাণ্ডের চিহ্ন নয়—এটি সতর্কবার্তা। পাহাড়ি বাজারগুলোতে অধিকাংশ সময়ই নেই অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, পানির রিজার্ভ, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক বা জরুরি সাড়া দেওয়ার দ্রুত ব্যবস্থা।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দাবি, পুনর্বাসনের পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি প্রণোদনা দরকার। আর স্থানীয়দের একটাই জোরালো দাবি—আগামীতে যেন আর কোনো বাজার আগুনে পুড়ে না যায়।


