পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে শুনশান পাহাড় । একসময় হাতি, সাম্বার হরিণ, ভালুক, বন্য মহিষ, গয়াল, বনমোরগসহ শতাধিক প্রাণী পাহাড়ের বুক জুড়ে বিচরণ করত। কিন্তু বন উজাড়, জুম চাষ, ভিনদেশি কাসাভা ও কচু চাষ, বেপরোয়া শিকার এবং মানুষের আবাদ-আবাসের প্রসারে আজ সেই সব প্রাণী বিলুপ্তির পথে।
একসময় এই পাহাড়ের বাসিন্দাদের ভোরের ঘুম ভাঙত পাখিদের সুমধুর কলতান—ময়না, টিয়া, ঘুঘু, ডাহুক, কাকাতুয়া, ধনেশ। এখন সেই গান আর শোনা যায় না। বনমহিষ, বনমোরগ, গয়াল, লজ্জাবতী বানর, চশমাপড়া হনুমান, ভালুক, বন্য শূকর, সজারু, অজগর—সবই আজ দুষ্প্রাপ্য।
ইতিহাসের সাক্ষী হাচিনসন
১৮৯০–১৯০১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম প্রশাসক আর. এইচ. স্নেইড হাচিনসন একসময় পাহাড়ের বন্যপ্রাণীর বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তার লেখা An Account of the Chittagong Hill Tracts-এ দেখা যায়, একসময় এখানে বেঙ্গল টাইগার, অন্তত তিন ধরনের হরিণ, দুই শিংয়ের গন্ডার, হাতি, তিন ধরনের ভালুক, মার্বেল ক্যাট, গয়াল, বনগাই, চিতাবাঘ, বন্য শূকর, বনমোরগ, ময়ূর, বনমহিষ, অজগর, বিষধর সাপ, নদীর হাঙরসহ বহু প্রাণী ছিল।
তিনি উল্লেখ করেছিলেন, গয়াল সবচেয়ে বেশি পাওয়া যেত রামগড় ও মানিকছড়িতে। কিন্তু গত অর্ধশতাব্দীতে এ প্রাণীর দেখা মিলেছে না।
বনাঞ্চলের ধ্বংস ও শিকার
পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট ৫,১৩৮ বর্গমাইলের মধ্যে ১,১২১ বর্গমাইল সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং ২,৪৬৩ বর্গমাইল অশ্রেণিভুক্ত বন রয়েছে। কিন্তু বন উজাড়, জুম চাষ এবং চাষাবাদের কারণে পাহাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন বিরান। বনশূন্য হয়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। নির্বিচারে শিকারের ফলে হাতি, হরিণ, ভালুকসহ অগণিত প্রাণী বিপন্ন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান বলেন, “গত এক শতাব্দীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে গন্ডার, বানতেং, বর্মি ময়ূর, শ্লথ বেয়ার সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে কেবল প্যারা হরিণ ও গাউরের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।”
রাঙামাটির দুর্গম কাচালং বনে গত বছর সূর্য ভালুক, কালো ভালুক, সাম্বার হরিণসহ কিছু বন্যপ্রাণী দেখা গেছে। এমনকি বেঙ্গল টাইগারের বিচরণের তথ্যও মিলেছে। তবে বন রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না হলে এসব প্রাণী খুব শিগগিরই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
হাতির সংকট
নব্বইয়ের দশকেও খাগড়াছড়ির রামগড় এলাকায় ২০–২৫টি হাতি বিচরণ করত। কিন্তু এখন পুরো জেলা থেকে হাতি বিলীন। রাঙামাটি ও বান্দরবানের বনে কিছু হাতি থাকলেও শিকার ও দুর্ঘটনায় সংখ্যা কমছে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, গত ৯ বছরে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ১১৪টি হাতি মারা গেছে—গোলিতে ৭টি, বিদ্যুতের ফাঁদে ২৬টি, দুর্ঘটনায় ১৮টি, অসুস্থতায় ৪০টি, বার্ধক্যে ১৫টি, অজ্ঞাত কারণে ১০টি।
মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন সাঙ্গু-মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনে হাতির মাংস শিকারের প্রমাণও পাওয়া গেছে।
শিকারি ও পাচার
হরিণ, শূকর, বনমোরগ এখন শিকারিদের প্রধান লক্ষ্য। দেশীয় বন্দুক, জাল, বিষটোপ ব্যবহার করে শিকার করা হচ্ছে। জীবিত হরিণ, ময়না, টিয়া, গুইসাপ, তক্ষকসহ বিভিন্ন প্রাণী পার্বত্য এলাকা থেকে সমতলে পাচার হচ্ছে।
গত ৬ জানুয়ারি খাগড়াছড়ির তেঁতুলতলা এলাকার একটি বাগানবাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছে এশীয় কালো ভালুক, ৬টি মায়া হরিণ ও দুটি বানর।
সচেতনতা ও সংরক্ষণ জরুরি
বায়োডাইভার্সিটি কনজারভেশন সোসাইটি অব সিএইচটির সংগঠক সমীর মল্লিক বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক বন অনেকাংশে উজাড় হয়ে গেছে। বন্যপ্রাণী রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি।”
খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিয়া বলেন, “বন্যপ্রাণী প্রকৃতির অলংকার। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তাদের ভূমিকা অপরিসীম। তাই সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।”
পাহাড়ের এই নিস্তব্ধ বন্যজীবন যদি আমরা রক্ষা না করি, আগামী দশকে কেবল ইতিহাসের পাতায় পড়ে থাকবে এই অঞ্চলের হাতি, হরিণ, ভালুকের গল্প।


