রাঙ্গামাটির জুম পাহাড়ে একসময় হলুদের হলুদ জমি গ্রামের প্রাণধারা হিসেবে বিবেচিত হত। কিন্তু এবার সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। আবহাওয়া, জমির উর্বরতা ও রোগবালাইয়ের কারণে উৎপাদন আশানুরূপ হয়নি, আর বাজারেও দাম কম। প্রান্তিক চাষিরা হতাশ, কেউ কেউ ভাবছেন, হলুদের আবাদ থেকে মুখ ফেরানো ছাড়া উপায় নেই।
চাষিরা বলছেন, দাম কম আর উৎপাদন কম—কৃষি বিভাগের সহায়তা না দিলে পাহাড়ি হলুদের স্বপ্ন হারাবে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, প্রণোদনা ও বীজ-সার বিতরণের মাধ্যমে চাষিদের সহায়তা করা হচ্ছে।
রাঙ্গামাটির প্রান্তিক কৃষক আজিম উদ্দিন প্রায় দেড় একর পাহাড়ি জমিতে হলুদের চাষ করেন। ফেব্রুয়ারিতে জমি থেকে হলুদ সংগ্রহ হলেও, আবহাওয়া, জমির উর্বরতা ও রোগবালাইয়ের কারণে ফলন আশা অনুযায়ী হয়নি। বাজারেও দাম নেই; গত বছরের তুলনায় এ বছর দাম অনেক কম। এতে চাষিরা হতাশ, এবং অনেকেই হলুদের আবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন বলে মনে করছেন।
আজিম উদ্দিনের বাড়ি লংগদু উপজেলার আটারকছড়া গ্রামে। গত প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি হলুদ ও আদা চাষ করে জীবন-যাপন করেন। নিজের কোনো ধানের জমি না থাকায় পাহাড়ি টিলা জমিতে এই চাষই তার আয়ের মূল উৎস। পাশাপাশি অন্যান্য কৃষকের কাছ থেকে হলুদ কিনে স্থানীয় বাজার ও খাগড়াছড়ির বড় বাজারে বিক্রি করেন।
চাষি আজিম উদ্দিন বলেন, হলুদের উৎপাদন দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। মাটির উর্বরতা আগের মতো নেই, রোগবালাই বেশি হয়। এখন চাষে লাভ নেই। প্রতিমণ শুকনো হলুদ ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকার বেশি যাচ্ছে না। তবে কোনো কোনো বাজারে ৭ হাজার পর্যন্ত দাম উঠেছে। গত বছর এ দাম ছিল ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। চাহিদা মেটাতে হলে কৃষকদের সরকারিভাবে প্রণোদনা প্রয়োজন।”
স্থানীয় হলুদ ব্যবসায়ী খলিল জোমাদ্দার জানান, চাষের শুরুতেই কৃষকদের দাদন দিয়ে থাকি। এরপর হলুদ শুকিয়ে বাজারে তুলতে গেলে উৎপাদন খরচ ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা। পরিবহন খরচও যুক্ত হলে লাভ পাওয়া কঠিন। এ বছর কৃষক নয়, ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বেশি।”
রাঙ্গামাটির জুম পাহাড়, ছোট টিলা ও অন্যান্য পাহাড়ি এলাকায় হলুদের চাষ বেশি হয়। তবে দীর্ঘদিন একই জমিতে চাষের ফলে মাটির উর্বরতা কমে গেছে বলে কৃষকরা জানান।
আরেক চাষি প্রভু রঞ্জন চাকমা বলেন, “জুমের এক পাহাড়ে বেশিদিন চাষ করা যায় না। বাজারেও দাম বেশি পাওয়া যায় না। সরাসরি বড় বাজারে নিলে বেশি লাভ হবে।”
দূর্গম ভূষণছড়া ইউনিয়নের পরানধন চাকমা বলেন “ফলন আগের মতো নেই, রোগবালাই ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। ৩০০ মণ কাঁচা হলুদ শুকিয়ে ৫০ মণ প্রস্তুত করেছি, তবে বাজারে দাম না থাকায় এখনও বিক্রি করিনি। এই অবস্থা চললে চাষের আগ্রহ কমবে।”
রাঙ্গামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন,“পার্বত্য জেলায় পাহাড়ি পতিত জমিতে মসলাজাতীয় ফসলের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। হলুদের চাষ বাড়ানো গেলে আমদানি নির্ভরতা কমবে, দেশীয় অর্থ সাশ্রয় হবে এবং স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে।”
এ বছর রাঙ্গামাটিতে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে হলুদের আবাদ হয়েছে। জেলার ৩০০ চাষিকে প্রথমবারের মতো প্রণোদনা হিসেবে ১০০ কেজি হলুদের বীজ ও ১০ কেজি সার দেওয়া হয়েছে। মোট উৎপাদন হয়েছে ১০ হাজার মেট্রিকটন, যা লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি। জেলার বাজার মূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা।


