পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে শহরে ঢোকার আগেই চোখে পড়ে এক সুউচ্চ মিনার। অনেকের কাছেই সেটিই যেন পথচিহ্ন—‘খাগড়াছড়ি এসে গেছি’। এই মিনারের নিচেই দাঁড়িয়ে আছে দেড় শতাব্দীর ইতিহাস বয়ে চলা খাগড়াছড়ি কেন্দ্রীয় শাহী জামে মসজিদ। এটি শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; এটি দেড় শতাব্দীর ইতিহাস, বিশ্বাস আর সম্প্রীতির এক জীবন্ত দলিল।
১৮৪০ সালের এক সময়—যখন খাগড়াছড়ি ছিল ছোট্ট বাজার আর রামগড় মহকুমার অন্তর্গত একটি নিভৃত গ্রাম—সেখানেই শুরু হয় এক আধ্যাত্মিক যাত্রা। হাজী বাদশা মিঞা সওদাগরের উদ্যোগে চেঙ্গী নদীর তীরে কাঠ আর শন দিয়ে গড়ে ওঠে ছোট্ট একটি উপাসনালয়। কে জানত, সেই বিনম্র সূচনা একদিন হয়ে উঠবে জেলার গৌরব?
নদীপথ ছিল তখনকার জীবনরেখা। রাঙ্গুনিয়া ও রাউজান থেকে আগত ব্যবসায়ীরা রাঙামাটি ও মহালছড়ি হয়ে চেঙ্গী নদী পথ ধরে বাণিজ্যে আসতেন। তাদের পদচারণা, তাদের দোয়া আর তাদের শ্রমেই প্রাণ পায় এই মসজিদ। টিনশেডের ঘর পেরিয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা পরিণত হয় আজকের তিনতলা বিশাল নান্দনিক ভবনে।

প্রায় ১০ হাজার বর্গফুট জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে ৯৫ ফুট আর পূর্ব-পশ্চিমে ১০০ ফুট বিস্তৃত—সংখ্যাগুলো যতটা বড়, তার উপস্থিতি যেন তারও চেয়ে বিশাল। তিনটি গম্বুজ আর সুউচ্চ মিনার শহরের আকাশরেখাকে আলাদা পরিচয় দেয়। রাতের আলোয় মিনারের কারুকাজ ঝলমল করলে মনে হয় পাহাড়ের বুকে জ্বলছে এক নীরব আলোকস্তম্ভ।
ভেতরে ঢুকলেই চোখ আটকে যায় ঝাড়বাতির আলোছায়ায়, দেয়ালের সূক্ষ্ম নকশায় আর ইট-পাথরের মেলবন্ধনে। পূর্ব-দক্ষিণ পাশে সুবিন্যস্ত ওজুখানা ও শৌচাগার—সব মিলিয়ে একসঙ্গে প্রায় পাঁচ হাজার মুসল্লির নামাজ আদায়ের সুব্যবস্থা। আধ্যাত্মিক প্রশান্তি আর স্থাপত্য-নান্দনিকতা এখানে হাত ধরাধরি করে চলে।
তবে এই মসজিদের সবচেয়ে বড় পরিচয় কেবল স্থাপত্য নয়—এটি সম্প্রীতির প্রতীক। পাহাড়ি জনপদের বহুবর্ণ সংস্কৃতির মাঝেও এখানে ছিল সহাবস্থানের উজ্জ্বল চর্চা। একসময় বিভিন্ন ধর্মের মানুষ মানত করে এখানে মোমবাতি জ্বালাতেন—যা এ অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

নামাজ শেষে স্থানীয় মুসল্লি মোহাম্মদ লেয়াকত সওদাগর আবেগভরে বলেন, “সুউচ্চ মিনার দেখলেই বোঝা যায় খাগড়াছড়ি শহরে এসে গেছি। এখানে নামাজ আদায় করতে পারা সত্যিই সৌভাগ্যের।” তার কথায় যেন মিশে আছে বহু মানুষের অনুভূতি।
শুধু আধ্যাত্মিক নয়, প্রশাসনিক দিক থেকেও মসজিদটি স্বনির্ভরতার উদাহরণ। ২৮টি দোকান-প্লট থেকে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টাকা আয়, জুমার দান থেকে আরও ৬-৭ লাখ টাকা, সঙ্গে কৃষিজমি ও পুকুরের আয়—সব মিলিয়ে নিজস্ব তহবিলেই চলে অধিকাংশ কার্যক্রম। একজন খতিবসহ মোট আটজন কর্মরত আছেন; সকালে শিশুদের জন্য চালু রয়েছে মকতব শিক্ষা।
এক সময় রমজানে সর্বজনীন ইফতারের আয়োজন ছিল এ মসজিদের প্রাণ। প্রশাসনিক কারণে তা এখন বন্ধ, কিন্তু প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনও জীবন্ত সেই ভ্রাতৃত্বের সন্ধ্যা। আজও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা এখানে নামাজ আদায় করেন, ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখেন।
দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে খাগড়াছড়ির সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকা এই মসজিদ আজও প্রমাণ করে—ঐতিহ্য শুধু অতীতের গল্প নয়, এটি বর্তমানের শ্বাস-প্রশ্বাস। পাহাড়ের নীরবতা ভেঙে যখন আজানের ধ্বনি ভেসে আসে, তখন মনে হয় ইতিহাস নিজেই যেন কথা বলছে।


