পার্বত্য চট্টগ্রামকে আগামী তিন বছরের মধ্যে উপমহাদেশের অন্যতম সেরা পর্যটন অঞ্চলে রূপান্তর করতে চান পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেছেন, শান্তি, সম্প্রীতি ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত রেখে ইকো-ট্যুরিজমের উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জনে কাজ করবে সরকার।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, পর্যটন ও ভূমি বিরোধসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
ইকো-ট্যুরিজমকে গুরুত্ব
প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিতভাবে পর্যটন খাতকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে পাহাড় ও বনভূমির পরিবেশ নষ্ট করে কোনো ধরনের পর্যটন কার্যক্রম অনুমোদন দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, পর্যটনের পাশাপাশি কৃষি ও ফল উৎপাদনেও পার্বত্য অঞ্চলের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। রাবার শিল্পসহ কৃষি খাতকে আধুনিকায়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। অনেক ফল উৎপাদিত হলেও সংরক্ষণ ও পরিবহন সুবিধার অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। এ সমস্যা সমাধানে কোল্ড স্টোরেজ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান পরিকল্পনা
পার্বত্য অঞ্চলের তরুণদের কর্মসংস্থানের বিষয়েও বেশ কিছু পরিকল্পনার কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, এখানে একটি স্পোর্টস একাডেমি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। কারণ পার্বত্য অঞ্চলের অনেক ফুটবলার, বিশেষ করে নারী ফুটবলাররা জাতীয় দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
তিনি বলেন, নিজ এলাকায় প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করতে একটি স্টেডিয়াম ও স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি তুলে ধরতে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে জোর
পার্বত্য অঞ্চলের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেখানে দুটি বড় ঘাটতি রয়েছে—শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। তার মতে, প্রত্যাশিত মাত্রায় শিক্ষার আলো এখনো সব এলাকায় পৌঁছায়নি। একই সঙ্গে অনেক মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছেন।
তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে প্রায় আড়াই লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ প্রাথমিক পর্যায়েই ঝরে পড়ে। পারিবারিক দারিদ্র্য ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাই এর প্রধান কারণ।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। হেলথ কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজন
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের ওপর জোর দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনেক এলাকায় এখনো সড়ক যোগাযোগের অভাব রয়েছে। রাস্তা না থাকলে স্কুল বা হাসপাতাল নির্মাণও কঠিন হয়ে যায়।
সড়ক যোগাযোগ উন্নত করা গেলে মানুষের যাতায়াত সহজ হবে, পণ্য পরিবহন বাড়বে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগও সম্প্রসারিত হবে বলে মনে করেন তিনি।
ভূমি বিরোধের সমাধানে সংলাপ
পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই সমস্যার সমাধান সংলাপের মাধ্যমেই করতে হবে। কোনো কিছু জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হবে না। মানুষের সঙ্গে কথা বলে এবং আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
‘রংধনু জাতি’ গঠনের লক্ষ্য
পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে কাজ করছে। তিনি বলেন, “আমরা একটি রংধনু জাতি গঠন করতে চাই, যেখানে সব ধর্ম, বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী ও মতের মানুষ একসঙ্গে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।”
এই লক্ষ্য অর্জনে পার্বত্য অঞ্চলের সব জনগোষ্ঠীর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।


