খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে পাঁচ বছর আগেও ছিল শুধু অভাব। জুম চাষই ছিল একমাত্র ভরসা। সেই গ্রামেই আজ সবুজ বিপ্লব এনেছেন এক তরুণ—রেম্রাচাই মারমা। মাধ্যমিকে অকৃতকার্য হয়ে বইখাতা ছেড়েছেন, কিন্তু মাটি ছাড়েননি। আর সেই মাটিই তাকে দিয়েছে সোনার ফসল।
মানিকছড়ি উপজেলার দূরছড়ি গ্রামের এই ২২ বছরের যুবক এখন ১০ একর জমিতে প্রায় ৩ হাজার পেঁপে গাছের মালিক। চলতি বছরেই বিক্রি করেছেন প্রায় ২০ লাখ টাকার পেঁপে, আর গাছে ঝুলছে আরও ৫ লাখ টাকার ফল। ভবিষ্যতে আরও ৩ হাজার গাছের চারা রোপণের পরিকল্পনাও রয়েছে তার।
শুরুটা ছিল ২০২১ সালে, স্কুলে পড়ার সময়—মাত্র ২০০টি গাছের ছোট্ট বাগান দিয়ে। ২০২৩ সালে পরীক্ষায় ফেলের পর পড়া ছেড়ে পুরোপুরি ঝাঁপিয়ে পড়লেন কৃষিতে। প্রথমে নিজেই মানিকছড়ি বাজারে পেঁপে বেচতেন। তারপর সামাজিক মাধ্যমে বাগানের ছবি ছড়িয়ে পড়তেই ঢাকার ব্যবসায়ীরা দরজায় এসে দাঁড়ালেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
তবে শুধু রেম্রাচাইয়ের গল্প নয়, বদলে গেছে গোটা দূরছড়ি গ্রাম। প্রায় ৬০টি পরিবারের এই গ্রামে প্রতি শুক্রবার গাছ থেকে পেঁপে নামে, কেজি যায় ৬০ টাকায়, সরাসরি ঢাকার ব্যবসায়ীদের হাতে। সেই পেঁপে এখন ঢাকার নামি সুপারশপের তাকেও। এই চাষকে কেন্দ্র করে অন্তত ৫০টি পরিবারের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, আর্থিকভাবে সুরক্ষিত ও স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে তারা।
রেম্রাচাইয়ের দেখাদেখি এগিয়ে এসেছেন নারী চাষি রাবাই মারমাও। ১ একর জমিতে গ্রিন লেডি হাইব্রিড জাতের পেঁপে চাষ করেছেন মাত্র ৪০ হাজার টাকা খরচে। অনুকূল পরিবেশ ও ভালো বাজারদর পেলে লক্ষাধিক টাকা আয়ের আশায় বুক বেঁধেছেন তিনি।
একইভাবে অংহলাপ্রু মারমাও স্বল্প খরচে পেঁপে চাষ করে লাভবান হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। কম জায়গায়, কম খরচে এবং ভালো দামের কারণে দূরছড়ি গ্রামের চাষিদের মধ্যে বাণিজ্যিক পেঁপে চাষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
রেম্রাচাইয়ের বাগান দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন দেবব্রত চাকমা নামের আরেক যুবকও। মাত্র ৩০ শতক জমিতে পেঁপে চাষ করে তিনি এখন প্রতি সপ্তাহে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকার পেঁপে বিক্রি করছেন।
ঢেউ ছড়িয়েছে খাগড়াছড়ি সদরেও। ভাইবোনছড়া এলাকার দুই বন্ধু জয়রাম চাকমা ও কল্পরঞ্জন চাকমা সাড়ে চার একর পতিত জমিতে জমি পরিষ্কার থেকে চারা রোপণ পর্যন্ত খরচ করেছেন প্রায় ১৫ লাখ টাকা। বিনিময়ে তুলে নিয়েছেন ৬৫ লাখ টাকার পেঁপে।
স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি চট্টগ্রাম, ফেনী ও ঢাকাসহ সারা দেশে যাচ্ছে তাদের ফল। তারা দাবি করেন, খাগড়াছড়িতে এটিই সবচেয়ে বড় পেঁপে বাগান। এখানে মূলত রেড লেডী, রাজশাহী পেঁপে, দেশি জাত ও হাইব্রিড চাষ হয়, তবে অধিকাংশ কৃষকের পছন্দ রেড লেডী জাত। বাগান দেখতে বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজনও আসছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলছেন, রেম্রাচাইয়ের সাফল্য দেখেই দূরছড়ি গ্রামে এখন আর কেউ বেকার নেই। অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে যে কেউ এই তরুণের মতো মডেল হতে পারেন। পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়া ফল চাষের জন্য আদর্শ হওয়ায় কৃষকেরা ভালো ফলন পাচ্ছেন, আর কৃষি বিভাগও পরামর্শ ও উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, পেঁপে চাষ বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক—রোপণের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ফল মেলে, সঠিক যত্নে টানা দুই বছর চলে একটি বাগান। এমনকি বসতবাড়ির আশপাশে বা ছাদবাগানে একটি-দুটি গাছ লাগালেও সারাবছর ফল ও সবজির জোগান মেলে। বেকার যুবকদের এই চাষে আগ্রহী করতে পারলে বেকার সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নেও বড় ভূমিকা রাখবে পেঁপে।
চলতি বছর খাগড়াছড়িতে পেঁপে চাষ হয়েছে ৪৩৬ হেক্টর জমিতে, উৎপাদনের লক্ষ্য সাড়ে ৬ মেট্রিকটন, আর চাষির সংখ্যা প্রায় ৩৫০।


