পাহাড়ি পথ বেয়ে যখন শিশুরা এসে জড়ো হলো পিটাছড়ার সবুজ প্রান্তরে, তখন সকালের আলো সবে ছড়িয়ে পড়ছে খাগড়াছড়ির বনে। তাদের চোখে কৌতূহল, মনে প্রশ্ন — বানর কি শুধুই দুষ্টু প্রাণী, নাকি এই সবুজ পাহাড়ের আসল রক্ষক? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বুধবার মাটিরাঙার পিটাছড়ায় বসেছিল এক ব্যতিক্রমী মেলা — ‘প্রাইমেট ফেয়ার-২০২৬’।
বুধবার সকালে মাটিরাঙার পিটাছড়ায় বসা ব্যতিক্রমী ‘প্রাইমেট ফেয়ার-২০২৬’ যেন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আয়োজিত হয়েছিল।
বনবিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বানর আসলে প্রকৃতির নীরব মালি। ফল খেয়ে বীজ ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তারা বন বিস্তারে যে ভূমিকা রাখে, তা অনেক সময় আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। খাগড়াছড়ি বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞা বলেন, “বন্যপ্রাণী প্রকৃতির খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাদের রক্ষা করতে হবে।” তিনি জানান, মাটিরাঙা ও আশপাশের এলাকায় লজ্জাবতী বানর, চশমাপরা হনুমান ও মুখপোড়া হনুমানসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাইমেট এখনো টিকে আছে। কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে হলে স্থানীয় মানুষদেরই এগিয়ে আসতে হবে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জগতেও বানর যেন একটু অবহেলিত। পিটাছড়া বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা মাহফুজ রাসেল বলেন, “যারা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করেন, তাদের অনেকের মধ্যেই বানরের সুরক্ষা নিয়ে কাজ করতে অনীহা দেখা যায়।” সেই অনীহার বিপরীতে দাঁড়িয়েই তিনি শুরু করেছেন এই উদ্যোগ। লক্ষ্য একটাই — নির্বিচারে বানর হত্যা বন্ধ করা। শিশুদের মনে যদি ছোটবেলা থেকেই এই বোধ জন্মায় যে বানর শত্রু নয়, বরং বনের বন্ধু — তাহলে বদলে যেতে পারে আগামীর চিত্র।
মেলায় সবচেয়ে বেশি ভিড় ছিল বায়োস্কোপ প্রদর্শনীর আশেপাশে। খেদাছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আলুটিলা বটতলী উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকশ শিক্ষার্থী সেখানে প্রথমবারের মতো চিনল নানা প্রজাতির প্রাইমেটদের। গান, কুইজ আর সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর হয়ে উঠল পাহাড়ের কোল। বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হলো গাছের চারা — যেন পুরস্কারটাও প্রকৃতিরই একটা বার্তা।
জার্মানভিত্তিক সংগঠন প্লামলরিস ই.ভি.-এর টিম লিডার ও বন্যপ্রাণী গবেষক হাসান আল রাজী চয়ন উঠিয়ে ধরলেন এক কঠিন সত্য — পার্বত্য এলাকায় পাহাড় আছে, কিন্তু ইকোসিস্টেম নেই। বন ধ্বংসের গতি এখানে অনেক বেশি। আর বন গেলে বানরও যায়, বানর গেলে বনের পুনর্জন্মও থমকে যায়। এই দুষ্টচক্র ভাঙতেই বারবার পাহাড়ে ফিরে আসেন তাঁরা — প্রাইমেট ফেয়ারের মতো আয়োজন নিয়ে, সচেতনতার বীজ বুনতে।


