Home কক্সবাজার ‘লাশটা হলেও চাই’— ট্রলারডুবিতে নিখোঁজদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারী উখিয়া-টেকনাফ

‘লাশটা হলেও চাই’— ট্রলারডুবিতে নিখোঁজদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারী উখিয়া-টেকনাফ

কেউ দালালের দরজায় ঘুরছেন একটু সংবাদের আশায়। কেউ ছুটছেন বেঁচে ফেরা মানুষের কাছে — প্রিয়জনের শেষ চিহ্নটুকু খুঁজতে। গত ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির পর কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফজুড়ে এখন শুধু হাহাকার আর অপেক্ষার নীরবতা।

পাহাড় সমুদ্র ডেস্ক

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪১

Share

কেউ দালালের দরজায় ঘুরছেন একটু সংবাদের আশায়। কেউ ছুটছেন বেঁচে ফেরা মানুষের কাছে — প্রিয়জনের শেষ চিহ্নটুকু খুঁজতে। গত ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির পর কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফজুড়ে এখন শুধু হাহাকার আর অপেক্ষার নীরবতা।

উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের হরিণমারার গিয়াস উদ্দিনের চোখে ঘুম নেই। তাঁর ভাই মোহাম্মদ আলী দালালের খপ্পরে পড়ে মালয়েশিয়ার পথে পা বাড়িয়েছিলেন। দালাল বলছে, ‘অন্য ট্রলারে আছে, কোস্টগার্ড ধরেছে, কয়েক দিনেই ফিরবে।’ কিন্তু বেঁচে ফেরা রফিকুলকে ছবি দেখাতেই সব আশা ভেঙে পড়ে। রফিকুল জানিয়েছেন, মোহাম্মদ আলী সেই ডুবন্ত ট্রলারেই ছিলেন।

গিয়াস বলেন, ‘মা শুধু কান্নাকাটি করছেন আর ভাইকে খুঁজছেন।’

নিখোঁজ মোহাম্মদ আলমের ভাই সেলিমের কণ্ঠে ক্ষোভ আর আর্তনাদ একসঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দালালরা মানুষ নিয়ে সাগরে মেরে ফেলছে। ভাই বেঁচে আছে না মরে গেছে জানি না। যদি মরেও যায়, শুধু লাশটা চাই। এই খুনি দালালদের বিচার চাই।’

বেঁচে ফেরা দুজন — রফিকুল ইসলাম ও রাহেলা বেগম — জানিয়েছেন ট্রলারের ভেতরের সেই বিভীষিকার কথা। ২৮০ জন যাত্রীকে ঠেসে দেওয়া হয়েছিল চারটি গোপন কক্ষে, যেখানে সাধারণত মাছ বা বরফ রাখা হয়। পানির দাবিতে হৈচৈ করলেই ঢাকনা বন্ধ করে দিত দালালরা। ৭ এপ্রিল রাতে দম বন্ধ হয়ে জ্ঞান হারান অনেকে। তিনটি কক্ষ থেকে অন্তত ৩৩ জনের নিথর দেহ বের করে সাগরে ছুড়ে ফেলা হয়।

ক্যাম্প-১৫-এর রাহেলা বেগম ২০ জন নারীর মধ্যে একমাত্র বেঁচে ফিরেছেন। কাঠের টুকরো আঁকড়ে দুই দিন এক রাত উত্তাল সমুদ্রে ভেসেছিলেন তিনি। রাহেলা বলেন, ‘চোখের সামনে কত মানুষকে ডুবতে দেখলাম। এখন সবাই আসছেন স্বজনের খোঁজে। কিন্তু আমি কারো উত্তর দিতে পারছি না। সেই দৃশ্য মনে পড়লেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলছি।’ তাঁর ভাই জানান, রাহেলা এখন মানসিকভাবে পুরোপুরি বিপর্যস্ত।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাচারকারীরা ‘ভালো কাজের’ প্রলোভন দিয়ে রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের টেকনাফের গোপন গুদামে আটকে রাখে। রাতের আঁধারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ছোট নৌকায় করে গভীর সমুদ্রে নিয়ে বড় ট্রলারে তোলা হয়।

উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন এই চক্রকে ‘সংগঠিত আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট’ বলে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘এদের সমূলে উৎপাটন না করলে এই মৃত্যুমিছিল থামবে না।’
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, নয় বছরেও কোনো প্রত্যাবাসন হয়নি — এই হতাশাই মানুষকে বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিচ্ছে। মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান।

এখন পর্যন্ত মাত্র ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি দুই শতাধিক মানুষের পরিণতি এখনো অজানা।

সর্বশেষ :

আরও পড়ুন: