জন্মনিবন্ধন করাতে দুই হাজার টাকা। বিনামূল্যে পাওয়া ৩০ কেজি চাল তুলতে সাড়ে তেরোশো টাকা। আর যেকোনো সরকারি কাজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাহাড় ডিঙিয়ে, খাল-ঝিরি পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় উপজেলা সদরে। এটাই বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার কুরুকপাতা ইউনিয়নের প্রায় ১৫ হাজার মানুষের রোজকার বাস্তবতা।
২০১৪ সালে নাগরিক সুবিধার কথা মাথায় রেখে ইউনিয়নটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু এক যুগ পেরিয়ে গেলেও ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব কোনো ভবন নেই। উপজেলা সদরের পানবাজার এলাকায় একটি ভাড়া ঘরে ডিজিটাল ব্যানার টাঙিয়ে চলছে পরিষদের কার্যক্রম। পুরো ইউনিয়নে নেই বিদ্যুৎ, নেই মোবাইল নেটওয়ার্ক।
সেন্দু পাড়ার বাসিন্দা চিংতুই ম্রো (৩৫) বলেন, ‘নিজ পাড়া থেকে পাহাড় ডিঙিয়ে, খাল-ঝিরি পার হয়ে প্রথমে আসতে হয় দরি পাড়ায়। সেখান থেকে ভাড়ার মোটরসাইকেলে উপজেলা সদরে। একবারের ভাড়া এক হাজার টাকা, আসা-যাওয়ায় দুই হাজার।’ তিনটি সন্তানের জন্মনিবন্ধন করাতে গিয়ে তিনবারই এই খরচ গুনতে হয়েছে তাঁকে।
সরকারের ভিজিডি কর্মসূচিতে বিনামূল্যে ৩০ কেজি চাল পাওয়ার কথা দুস্থ পরিবারগুলোর। কিন্তু সেই চাল নিতে কুরুকপাতা বাজার পয়েন্টে যেতে মোটরসাইকেল ভাড়া এক হাজার টাকা, ভাত খাওয়ার খরচ দুইশো, ইউনিয়ন পরিষদে একশো, চাল ওঠানোর মজুরি চল্লিশ — মোট ১৩৪০ টাকা। ফলে অনেকে এই চাল নিতেই যান না। সেই চাল পরে কোথায় যায় কেউ জানে না।
৮ নম্বর ওয়ার্ডের পাড়াপ্রধান ইয়াংরিং কারবারী বলেন, ‘এত টাকা খরচ করে উপজেলা সদরে আসার সুযোগ নেই। তারা মেম্বারের হাতে তথ্য তুলে দেয়, কয়েকটা জমলে মেম্বারই গিয়ে জন্মনিবন্ধন করিয়ে আসে।’
স্বাস্থ্যসেবার অবস্থাও করুণ। পুরো ইউনিয়নে একটিমাত্র কমিউনিটি ক্লিনিক, তাও স্বাস্থ্যকর্মীশূন্য। ম্যালেরিয়া প্রবণ এই এলাকায় বড় অসুখ হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে যেতে হয়। দরি পাড়ার লাওলি ম্রো জানান, ‘প্রতিবছর বর্ষার আগে ডায়রিয়া হয়। চিকিৎসার অভাবে মারাও যায় কেউ কেউ।’
কুরুকপাতার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১১৭ শিক্ষার্থী পড়ে। বহু পাহাড়-ঝিরি পেরিয়ে আসতে হওয়ায় স্কুলটি আবাসিক পদ্ধতিতে চলছে — সরকারি উদ্যোগ নয়, শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিজস্ব প্রচেষ্টায়। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের সরঞ্জাম আছে, কিন্তু নেটওয়ার্ক না থাকায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
ইউপি চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, ‘সব সমস্যার সমাধান বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কের মধ্যে। মোবাইল কোম্পানিগুলো এলাকা পরিদর্শন করে গেছে, কিন্তু বিদ্যুৎ ছাড়া টাওয়ার বসাতে রাজি নয়।’
পাহাড়ে দীর্ঘদিন কাজ করা সাংবাদিক ফরিদুল আলম সুমন বলেন, ‘সরকার যদি হেলিকপ্টারে ব্যালট পাঠিয়ে ভোট নিতে পারে, তাহলে বিশেষ ব্যবস্থায় সৌরবিদ্যুৎ ও স্টারলিংক ইন্টারনেটও দিতে পারার কথা।’
আলীকদম ইউএনও মনজুর আলম জানিয়েছেন, ভূমি অফিসকে জায়গা দেখতে বলা হয়েছে। উপযুক্ত জায়গা পেলে ভবন নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হবে। তবে এই ইউনিয়নে বিদ্যুৎ পৌঁছানো এখনও ‘খুবই চ্যালেঞ্জিং’ বলে স্বীকার করেছেন তিনি।


