Home মতামত পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন: সংকট পেরিয়ে সম্ভাবনার পথে

পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন: সংকট পেরিয়ে সম্ভাবনার পথে

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বিস্তৃত সবুজ পাহাড়, নীল জলরাশি আর মেঘছোঁয়া চূড়ার যে স্বপ্নভূমি, তার নাম পার্বত্য চট্টগ্রাম। তিন জেলা— রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জন্যও অনন্য।

ইয়াসির সিলমী

প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৫৭

Share

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বিস্তৃত সবুজ পাহাড়, নীল জলরাশি আর মেঘছোঁয়া চূড়ার যে স্বপ্নভূমি, তার নাম পার্বত্য চট্টগ্রাম। তিন জেলা— রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জন্যও অনন্য।

কাপ্তাই হ্রদের নীল জল, সাজেকের মেঘের সমুদ্র, নীলগিরির দিগন্তছোঁয়া দৃশ্য কিংবা পাহাড়ি জনপদের উৎসব—সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। তবে বহুমাত্রিক কারণে সম্ভাবনার এই ভূখণ্ড আজও পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়নি।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নতুন সরকারের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বহু প্রত্যাশা।

মোটাদাগে বিএনপি সরকারকে এ অঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে তিনটি বিষয়ে জোর দিতে হবে। সেগুলো হল: পাহাড়ে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা; স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও অবকাঠামো উন্নয়ন; পর্যটন শিল্পের বিকাশে মহাপরিকল্পনা ও বিনিয়োগ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান খুব সীমিত। বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের বিভিন্ন পরিকল্পনা অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ৮৫টি সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পট রয়েছে। এ ছাড়া ছোট–বড় মিলিয়ে শতাধিক দর্শনীয় স্থান রয়েছে, যার অধিকাংশই এখনও পর্যটনের মূলধারায় আসেনি। বর্তমানে তিন জেলায় প্রায় ৪০০টি হোটেল ও আবাসন সুবিধা থাকলেও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অবকাঠামো এখনও সীমিত।
ধারণা করা হয়, বছরে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ পর্যটক এই অঞ্চল ভ্রমণ করেন এবং পর্যটন খাত থেকে কয়েক শ কোটি টাকা আমাদের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়। পরিকল্পিত উন্নয়ন হলে এই খাত কয়েক গুণ সম্প্রসারিত হয়ে হাজার কোটিতে উন্নীত হবে। তবে তার আগে এখানকার সংকটগুলো দূর করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকটের মূলে রয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, আস্থার সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, দুর্বল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত ও দীর্ঘদিনের শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অপূর্ণতা। এসবই এখানকার উন্নয়ন ও পর্যটন বিকাশে বড় বাধা হয়ে আছে। অথচ সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর নীতি ও টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পই হতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রধান হাতিয়ার।

এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত আস্থার সেতু পুনর্গঠন। তাই পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পাহাড়ি সংগঠন, নাগরিক সমাজ, উন্নয়ন সংস্থা, নারী ও তরুণদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি উন্মুক্ত সংলাপ-প্রক্রিয়া শুরু করা জরুরি। ভূমি কমিশনকে কার্যকর করা, বিরোধ নিষ্পত্তিতে সময়সীমা নির্ধারণ এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণে বাস্তব অগ্রগতি দেখাতে পারলেই শান্তির ভিত্তি মজবুত হবে।

এবার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেটি হল, প্রথমবারের মতো এই মন্ত্রণালয়ে একজন পাহাড়ি নেতার পাশাপাশি একজন বাঙালিকেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এখন যদি দুই মন্ত্রী পারস্পরিক সহযোগিতা ও সরকারের পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য বিভাগের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করেন, তাহলে পাহাড়ি ও বাঙালির মধ্যে আস্থার নতুন সেতুবন্ধ তৈরি হতে পারে। পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এই আস্থার সম্পর্কই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। শান্তি স্থাপন হলেই স্থানীয় উন্নয়ন ও পর্যটন শিল্পের বিকাশে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া সহজ হবে।

পাহাড়-নির্ভর পর্যটনে বিশ্বে বহু সফল উদাহরণ আছে। নেপাল তার মধ্যে অন্যতম। মাউন্ট এভারেস্টকে ঘিরে ট্রেকিং ও পর্বতারোহণ শিল্প নেপালের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে। সেখানে পারমিট-ভিত্তিক প্রবেশ, প্রশিক্ষিত শেরপা গাইড, বর্জ্য ফেরত আনার বাধ্যবাধকতা—এসব নীতিমালা পরিবেশ রক্ষা ও আয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হয়েছে।

আরেকটি উদাহরণ সুইজারল্যান্ড। সুইস আল্পসকে কেন্দ্র করে তারা চার মৌসুমভিত্তিক পর্যটন গড়ে তুলেছে—স্কিইং, হাইকিং, কেবল-কার, লেক ট্যুর। অবকাঠামো উন্নত হলেও পরিবেশ সুরক্ষায় কঠোর বিধিনিষেধ আছে। স্থানীয় সংস্কৃতি ও কৃষিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে তারা ভ্যালু-চেইন তৈরি করেছে।

এছাড়া ভুটান-এর ‘হাই ভ্যালু, লো ইমপ্যাক্ট’ নীতি উল্লেখযোগ্য। সীমিত সংখ্যক পর্যটক, নির্ধারিত দৈনিক ফি ও সংস্কৃতি-সংরক্ষণে কঠোরতা—এসবের মাধ্যমে তারা প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ রক্ষা করে উচ্চ আয় নিশ্চিত করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন শিল্পের বিকাশে এ উদাহরণগুলো অনুসরণীয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশিদের মধ্যে ভ্রমণ প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হলে বিদেশি পর্যটকরাও এখানে ভ্রমণে আসবেন। এই চাহিদাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে বছরে হাজার কোটি টাকার শিল্পে পরিণত হতে পারে পার্বত্য পর্যটন।

লেখক: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।

সর্বশেষ :