রবিবার সকাল ১১টা। রাঙামাটি জেলা শহরের কাঁঠালতলি এলাকায় সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করছেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। স্লোগান চলছে — ‘টাকা লাগলে টাকা নে, নতুন করে কমিটি দে’। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের অভিযোগ, টাকার বিনিময়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে বিবাহিত, অছাত্র এবং রাঙামাটি শহরের বাইরে বসবাসকারী ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়েছে।
একই দিন রাত সাড়ে দশটা। পাহাড়ের আরেক জেলা বান্দরবান। বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সড়কে টায়ারে আগুন দিয়ে বিক্ষোভ করছেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তাঁদেরও ক্ষোভ একই। যাঁকে জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক করা হয়েছে, তিনি বিবাহিত, দুই সন্তানের বাবা, বয়স ৩৯ বছর।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান ও রাঙামাটিতে নতুন করে কমিটি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। আর এখন সেই কমিটি ঘিরে এভাবেই ক্ষোভ ঝাড়ছেন নেতাকর্মীরা।
পাহাড়ের দুই জেলায় নতুন কমিটি, এক জেলায় পূর্ণাঙ্গ
গত শনিবার (২ মে) সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, মহানগর ও জেলা পর্যায়ে একযোগে ২৯টি নতুন কমিটির অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। পার্বত্য চট্টগ্রামেও পড়েছে সেই ঢেউ। বান্দরবান ও রাঙামাটিতে দেওয়া হয়েছে নতুন আহ্বায়ক কমিটি। খাগড়াছড়িতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।
বান্দরবানে ফরহাদ হোসেন জিকুকে আহ্বায়ক ও শহিদুল ইসলামকে সদস্যসচিব করে ১০ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। রাঙামাটিতে আট বছর পর নতুন কমিটি এসেছে। মো. অলি আহাদ সভাপতি, নাঈমুল ইসলাম রনি সাধারণ সম্পাদক। উভয় কমিটিকে ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া খাগড়াছড়ি জেলা, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ কমিটিও অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় কমিটি।
‘ছাত্রদল করবে ছাত্ররা — বিবাহিতরা নেতৃত্ব দিলে ছাত্ররা যাবে কোথায়?’
কমিটি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বান্দরবানে রাস্তায় নামেন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে মিছিল বের হয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে হিলবার্ডের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে সড়ক অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে চলে বিক্ষোভ।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ছাত্রসংগঠনের নীতিমালা ও গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে একজন বিবাহিত ব্যক্তিকে আহ্বায়ক করা হয়েছে — যা সংগঠনের আদর্শের সরাসরি বিরোধী।
জেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব শহিদুল ইসলাম নিজেই দাঁড়ালেন কর্মীদের পাশে। তিনি বলেন, ‘৩৯ বছর বয়সী দুই সন্তানের জনককে ছাত্রদলের আহ্বায়ক করায় কর্মীরা হতাশ। ছাত্রদল করবে ছাত্ররা — বিবাহিতরা নেতৃত্ব দিলে ছাত্ররা কোথায় যাবে? এটা গঠনতন্ত্রের পরিপন্থী।’
রাঙামাটিতেও একই চিত্র। কাঁঠালতলি এলাকায় পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা সরাসরি অভিযোগ তুললেন — টাকার বিনিময়ে কমিটি বানানো হয়েছে। যাঁরা মাঠে ছিলেন না, শহরের বাইরে থাকেন, যাঁদের ছাত্রত্ব নেই — তাঁরাই পেয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ পদ।
রাঙামাটি কলেজ ছাত্রদল শাখার সহসভাপতি সুরেশ চাকমা বলেন, সভাপতি অপহরণের ঘটনার সঙ্গে জড়িত। আর সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধেও মাদকের মামলা রয়েছে। এরপলও তাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কমিটি বাতিলের সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত তাঁরা বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।
রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের সাবেক (সদ্য বিলুপ্ত) সহদপ্তর সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম বলেন, নতুন কমিটি আজ রাত ১২টার মধ্যে বাতিল করতে হবে। তা না হলে আগামীকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধসহ কঠোর আন্দোলন ঘোষণা করা হবে।
সহসভাপতি নূর তালুকদার মুন্না বলেন, যাকে রাজস্থলী থেকে এনে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে, তিনি রাঙামাটি শহরের নেতাকর্মীদেরই চেনেন না। তাকে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
যুগ্ম সম্পাদক পারভেজ হোসেন সুমন বলেন, আমরা জানতে পেরেছি, টাকা ও আইফোনের বিনিময়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা অবিলম্বে এই কমিটি বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। ছাত্রদলকে শক্তিশালী করতে হলে নিয়মিত ছাত্রদের নিয়ে কমিটি গঠন করতে হবে।
পদ পাওয়া নেতারা কি বলছেন
এ বিষয়ে নবগঠিত কমিটির সভাপতি অলি আহাদ বলেন, “ছাত্রদল একটি বড় সংগঠন। এখানে সবারই ত্যাগ আছে, কিন্তু সবাইকে একসঙ্গে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। যারা পদ পাননি, তারা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন -এটি স্বাভাবিক। তবে সবাইকে সংগঠনের শৃঙ্খলা মেনে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রাখতে হবে।
সাধারণ সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম বলেন, ‘বিক্ষোভকারীরা যে অভিযোগ করছে তা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও মিথ্যা। আংশিক কমিটি হওয়ায় সবার নাম এতে আসেনি। কমিটিতে নাম আসুক এটা অনেকেই চেয়েছিলেন। প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় তাঁরা ক্ষুব্ধ হয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছে। তবে তাঁরা আমার ভাই। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তাঁদের বিবেচনা করা হবে।’
কেন্দ্রের দাবি ‘গতিশীলতা’, নেতাকর্মীরা বলছেন ‘প্রহসন’
সংগঠনের গতিশীলতা বাড়াতেই এই কমিটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ। কিন্তু মাঠের নেতাকর্মীদের প্রশ্ন — গতিশীলতার নামে কি ত্যাগী কর্মীদের বঞ্চিত করতে হয়? বছরের পর বছর পাহাড়ের রোদ মাথায় নিয়ে যাঁরা দলের পতাকা ধরে রেখেছেন, তাঁরা কি কেন্দ্রের চোখে পড়েন না?
বিক্ষোভকারীরা অবিলম্বে কমিটি বাতিল করে নতুনভাবে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।
পরিস্থিতি দ্রুত না সামলালে বান্দরবান ও রাঙামাটিতে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও ঘনীভূত হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তারা বলছেন, একটি ছাত্রসংগঠনের আহ্বায়ক হওয়ার কথা তরুণ শিক্ষার্থীর — দুই সন্তানের ৩৯ বছর বয়সী বাবার নয়।


