সূর্য ওঠার আগেই পাহাড়ি সড়কের ধারে জমে ওঠে এক ভিন্ন জগত। কাঁধে ঝুড়ি, হাতে থলে কিংবা মাথায় বাঁশের ডালা—নিঃশব্দে এসে বসেন একদল নারী। একটু পরেই সাজানো হয় রঙিন পসরা—সবুজ শাক, পাহাড়ি ফল, জুমের ফসল আর নিজ হাতে ফলানো নানা উপকরণ। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ ফিরে পায় পুরো এলাকা।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালার লারমা স্কয়ারে গড়ে ওঠা এই হাট অন্যসব বাজার থেকে আলাদা। এখানে দোকানদার বলতে যাঁরা বসেন, তাঁরা সবাই নারী। প্রতিদিন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন নারী নিজের উৎপাদিত কিংবা সংগ্রহ করা পণ্য নিয়ে এখানে আসেন। পাহাড়ের ঢাল থেকে আনা তাজা সবজি, বিন্নি চাল, যব, তিল, চালতা, কমলা, পেঁপে—সব মিলিয়ে যেন এক জীবন্ত কৃষিসংস্কৃতির প্রদর্শনী।

এই হাটের প্রতিটি মুখের পেছনে আছে একেকটি আলাদা গল্প। মনিতা চাকমার জীবনও বদলে গেছে এই বাজার ঘিরেই। একসময় শহরে চাকরি করতেন। কিন্তু মহামারির সময় সব হারিয়ে ফিরে আসতে হয় গ্রামে। নতুন করে পথ খুঁজতে গিয়ে ছোট পরিসরে সবজি বিক্রি শুরু করেন।
প্রথম দিনের অভিজ্ঞতাই তাঁকে সাহস দেয়—অল্প সময়েই সব পণ্য বিক্রি হয়ে যায়। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। এখন নিজের উৎপাদনের পাশাপাশি অন্যদের কাছ থেকেও পণ্য সংগ্রহ করে বিক্রি করেন তিনি।
কমলা ত্রিপুরার জীবনও সংগ্রামের আরেক নাম। স্বামীকে হারানোর পর সংসারের ভার কাঁধে তুলে নিতে হয় তাঁকে। জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করা কন্দজাতীয় ফসল ও মরিচ বিক্রি করেই প্রতিদিনের খরচ মেটান। আয় খুব বেশি নয়, তবু তা দিয়েই দুই মেয়েকে বড় করছেন।

নন্দ রানী চাকমা দীর্ঘদিন ধরে এই হাটে বসছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর একাই সংসার সামলাতে গিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন এই পথ। বাজার থেকে পণ্য কিনে এনে এখানে বিক্রি করেন। এই উপার্জনেই মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন।
আবার বীণা চাকমার গল্পে আছে অন্যরকম দৃঢ়তা। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও যখন চাকরি পাননি, তখন সামান্য পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে আয় বাড়িয়ে নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে গেছেন। আজ তিনি নিজের পায়ে দাঁড়ানো একজন নারী।
এভাবে শাপলা চাকমা, যমুনা ত্রিপুরা, মল্লিতা, রনিকা কিংবা আলপনার মতো আরও অনেকেই প্রতিদিন এই হাটে বসেন। কারও স্বামী কর্মহীন, কারও নেই পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ। তবু তারা থেমে থাকেননি—নিজেদের মতো করে পথ তৈরি করেছেন।
এই বাজারে শুধু বিক্রেতাই নারী নয়, ক্রেতাদের বড় অংশও নারী। পাশাপাশি ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছেও এটি আকর্ষণীয় জায়গা। সাজেক ভ্যালি থেকে ফেরার পথে অনেকেই এখানে থামেন। টাটকা পণ্য আর তুলনামূলক কম দামের কারণে তাদের আগ্রহও কম নয়।
তবে সবকিছু এত সহজ নয়। খোলা আকাশের নিচে বসে ব্যবসা করতে গিয়ে বর্ষাকালে সমস্যায় পড়তে হয় বিক্রেতাদের। বৃষ্টি নামলেই পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই তাঁদের প্রত্যাশা—একটি স্থায়ী ছাউনি, যেখানে অন্তত প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কিছুটা সুরক্ষা মিলবে। তারপরও এই হাট থেমে থাকে না।
প্রতিদিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আবারও শুরু হয় নতুন দিন, নতুন বিক্রি, নতুন সংগ্রাম। পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা এই ছোট্ট বাজারটি আসলে কেবল কেনাবেচার জায়গা নয়—এটি নারীদের আত্মনির্ভরতার এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। এখানে প্রতিটি ঝুড়ি, প্রতিটি পণ্য আর প্রতিটি মুখ যেন একটাই কথা বলে—লড়াই করে বাঁচার গল্প।


