২০২৪ সালের জুলাই মাস। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুথিডং শহরের হইয়ার সিরি গ্রাম তখন এক ভয়াবহ জনশূন্য ধ্বংসস্তূপ। প্রাণভয়ে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গা মুসলিম গ্রামবাসীদের কয়েকজন লুকিয়ে নিজেদের গ্রামে ফিরে আসেন ফেলে আসা কিছু জিনিসপত্র উদ্ধার করতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান, পুরো গ্রাম যেন পরিণত হয়েছে এক নীরব মৃত্যুপুরীতে।
গ্রামের বাসিন্দা ওমর আহমদ পরে সেই ভয়াল অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জানান, গ্রামে কোনও গবাদিপশু বা হাঁস-মুরগি অবশিষ্ট ছিল না। অথচ আগে প্রতিটি বাড়িতেই এগুলো ছিল। স্থানীয়দের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, সবকিছু লুট করে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। এরপর তিনি সেই ধানক্ষেতের দিকে যান, যেখানে তার নিকটাত্মীয়সহ বহু গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়েছিল।
ওমর আহমদ বলেন, “চারপাশে মানুষের কঙ্কাল আর খুলি ছড়িয়ে ছিল। মাংস পচে গলে গেছে, কিন্তু অনেক লাশের কাপড় তখনও অক্ষত ছিল।”
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)-এর-এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের বিস্তারিত। ১৯ মে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২ মে উত্তর রাখাইনের হইয়ার সিরি গ্রামে জাতিগত রাখাইন সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি অন্তত ১৭০ জন রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে। আহত বা নিহত হন আরও শত শত মানুষ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে তীব্র লড়াইয়ের মধ্যে সাধারণ মানুষ এলাকা ছাড়ার চেষ্টা করলে তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। দীর্ঘদিনের সামরিক সেন্সরশিপ এবং দুর্গম পরিস্থিতির কারণে ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশ পেতে সময় লাগে। পরে প্রাণে বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়ার পর ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে এই হত্যাকাণ্ডের বিবরণ।
ওমর আহমদ নিজেও ২০২৫ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
দায় অস্বীকার আরাকান আর্মির
ঘটনার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান (ইউএলএ) বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। উল্টো রাখাইনে অবস্থানরত কয়েকজন গ্রামবাসীকে চাপ দিয়ে ভিডিও জবানবন্দি দিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যাতে তারা আরাকান আর্মিকে নির্দোষ বলে দাবি করেন।
তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, ৪১ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার, স্যাটেলাইট চিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি-ভিডিও বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সংস্থাটির মতে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে। তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা, হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, বেআইনি আটক এবং চিকিৎসাসেবা না দেওয়ার মতো যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
সংঘাতের পটভূমি
২০০৯ সালে গঠিত আরাকান আর্মি মূলত রাখাইন জনগণের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়াই শুরু করে। ২০১৮ সালের শেষ দিক থেকে রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। ২০২১ সালে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখলের পর সংঘাত আরও তীব্র হয়। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হয়।
এই সময়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার, কামান ও স্থলবাহিনী ব্যবহার করে হামলা চালায়। অন্যদিকে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধেও রোহিঙ্গা গ্রামে শেল নিক্ষেপ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ওঠে।
২০২৪ সালের এপ্রিল ও মে মাসে বুথিডং এলাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। জান্তা বাহিনী জোরপূর্বক রোহিঙ্গা যুবকদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দিতে শুরু করে। এতে রাখাইন বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলিমদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে।
বিপদের কেন্দ্রে হইয়ার সিরি
বুথিডং-রাথিডং সড়কের পাশে অবস্থিত হইয়ার সিরি গ্রামটির অবস্থান ছিল দুই সামরিক ঘাঁটির মাঝামাঝি। ফলে গ্রামটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়।
এপ্রিলজুড়ে আশপাশের গ্রাম থেকে বাস্তুচ্যুত বহু রোহিঙ্গা এসে সেখানে আশ্রয় নেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বরপাড়া ও ফাতাইল্লা পাড়া নিয়ে গঠিত গ্রামটির প্রায় প্রতিটি বাড়িতে দুই থেকে তিনটি পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল।
এদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী গ্রাম থেকে রোহিঙ্গা পুরুষদের ‘স্বেচ্ছাসেবক’ হিসেবে দাবি করে। গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিলে বাধ্য হয়ে কিছু লোককে পাঠান গ্রামবাসীরা। পরে এই ঘটনাই গ্রামটিকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।
১ মে রাতে যখন যুদ্ধ তীব্র আকার নেয়, তখন জান্তার পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেওয়া কিছু রোহিঙ্গা অস্ত্র ফেলে গ্রামে ফিরে আসেন। একই সময়ে আরাকান আর্মি গ্রাম খালি করার নির্দেশ দেয়। অন্যদিকে জান্তা বাহিনী গ্রামেই অবস্থান করতে বলে।
ফলে গ্রামবাসীরা পড়ে যান চরম উভয়সংকটে।
২ মে’র ভয়াবহ সকাল
২ মে ভোরে আরাকান আর্মি সামরিক ক্যাম্প দখল করে নেয়। এরপর পরাজিত জান্তা সেনারা হইয়ার সিরি গ্রামে ঢুকতে শুরু করলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সকাল সাতটার দিকে হাজার হাজার গ্রামবাসী ও বাস্তুচ্যুত মানুষ সাদা পতাকা হাতে বুথিডং শহরের দিকে রওনা হন। তারা যখন তৈনগা মুরা পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছান, তখন আচমকা চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনও ধরনের সতর্কতা ছাড়াই চারদিক থেকে গুলি চালাতে শুরু করে আরাকান আর্মির যোদ্ধারা।
হালিম হোসেন বলেন, “সব দিক থেকে গুলি আসছিল। পালানোর কোনও পথ ছিল না।”
কবির আহমেদ তার স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে মিছিলের মাঝখানে ছিলেন। তিনি বলেন, “প্রথমে আমার ছেলের গায়ে গুলি লাগে। এরপর স্ত্রী, কোলে থাকা শিশু কন্যা ও বড় মেয়েটিও গুলিবিদ্ধ হয়। আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার আগে হাতে থাকা টাকা দিয়ে বলেছিল, তুমি পালিয়ে যাও।”
প্রাণ বাঁচাতে অনেকে ধানক্ষেত কিংবা মসজিদের দিকে দৌড় দেন। আহত রাশিদা খাতুন জানান, মসজিদের পাশের ধানক্ষেতে বহু মানুষকে জড়ো করে গুলি করা হয়। তিনি লাশের নিচে পড়ে থাকার ভান করে প্রাণে বেঁচে যান।
তার ভাষায়, “কাউকেই রেহাই দেওয়া হয়নি।”
শিশুই ছিল নিহতদের অর্ধেকের বেশি
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, তারা নিহত ও নিখোঁজ অন্তত ১৭০ জনের পরিচয় নিশ্চিত করতে পেরেছে। এর মধ্যে ৯০ জনই শিশু।
তবে রোহিঙ্গা মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
পরবর্তীতে বেঁচে যাওয়া বহু রোহিঙ্গাকে আরাকান আর্মি বিভিন্ন এলাকায় আটকে রাখে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের কাছ থেকে টাকা ও গহনা লুট করা হয়। অনেককে অস্থায়ী ক্যাম্পে বন্দি করে রাখা হয়েছে, যেখানে খাদ্য ও চিকিৎসাসংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুরো হইয়ার সিরি গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না মূল বাসিন্দারা।
বর্তমানে অনেক বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিচারের দাবি জানাচ্ছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, জান্তা সরকার ও আরাকান আর্মি—উভয় পক্ষের নির্যাতনের কারণে রাখাইনে এখনো রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। সংস্থাটি জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের আসন্ন অধিবেশনে এই ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে স্বাধীন তদন্ত এবং দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করা যায়।


