Home বিশেষ প্রতিবেদন নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কার্যকর ভূমিকা চান পার্বত্যবাসী

নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কার্যকর ভূমিকা চান পার্বত্যবাসী

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ পাহাড়ে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এবার যেন কথার চেয়ে কাজ বেশি দেখা যায়।

পাহাড় সমুদ্র ডেস্ক

প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৭

Share

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। ছবি : পাহাড় সমুদ্র গ্রাফিক্স

দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংকটের ভার যেন জমে আছে পাহাড়ের বাতাসে। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের জট, ভূমি–বিরোধ, পাহাড়ি–বাঙালি সম্পর্কের টানাপোড়েন, চাঁদাবাজি ও আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা—সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তার এক বাস্তবতায় বসবাস করছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। এমন সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ পাহাড়ে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এবার যেন কথার চেয়ে কাজ বেশি দেখা যায়।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান এবং প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ব্যারিস্টার মীর হেলাল দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

শান্তিচুক্তি: আস্থার সংকট কাটবে?

দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক ও অবিশ্বাস কাটেনি। স্থানীয়দের একাংশের মতে, চুক্তির কিছু স্পর্শকাতর ও পরস্পরবিরোধী ধারা নিয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা ও পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন।

তাদের দাবি, জাতীয় স্বার্থ, সংবিধান ও সব জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার নিশ্চিত করে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা হোক।

রাঙামাটির শিক্ষার্থী উৎসব চাকমা বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে এতদিন কোনো স্পষ্ট রোডম্যাপ দেখিনি। নতুন মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রী যেন দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ দেখান, তা আশা করছি।

স্থানীয় এক শিক্ষকের মতে, চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলে বিভ্রান্তি বাড়ে। নতুন মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রীকে স্বচ্ছ অবস্থান নিতে হবে।

ভূমি প্রশ্নে সমাধান কোথায়?

ভূমি কমিশনের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। খাস জমি, সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জমির সুনির্দিষ্ট চিহ্নিতকরণ না হওয়ায় বিরোধ জিইয়ে আছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ডিজিটাল ভূমি জরিপ ও ভূমি কমিশন আইন সংশোধনের মাধ্যমে দ্রুত সমাধান চান।

খাগড়াছড়ির স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “ভূমির অনিশ্চয়তা থাকলে শান্তি আসে না। জমি নিয়ে বিরোধই অনেক সমস্যার মূল।”

চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতা

ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, চাঁদাবাজি এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, জেএসএস ও ইউপিডিএফের সশস্ত্র তৎপরতা, বিপুল অঙ্কের চাঁদা আদায়ের অভিযোগ এবং কেএনএফের অপহরণের ঘটনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

বান্দরবানের রিসোর্ট ব্যবসায়ী বাবু কর্মকরা বলেন, সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। নিরাপত্তা না থাকলে বিনিয়োগ আসবে না। উন্নয়নও হবে না।

তিনি বলেন, প্রতিবছর চাঁদাবাজি করতে এসে পাহাড়ের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করে দেয়। চাঁদা না দিলে তুলে নিয়ে যায়, ব্যবসা বন্ধ করে দেয়।

বৈষম্যের অভিযোগ

চাকরি, শিক্ষা, করনীতি, প্রশাসনিক পদায়ন, জমি ক্রয়–বিক্রয় এবং এনজিও প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈষম্যের অভিযোগও তুলছেন অনেকেই। তারা বলছেন, সমান সুযোগ নিশ্চিত না হলে সম্প্রীতি টেকসই হবে না।

একজন বিশ্লেষকের মতে, পাহাড়ে উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা বা অবকাঠামো নয়; আস্থার পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি।

কোটা বিরোধী ঐক্যজোটের আহ্বায়ক মো. জনি বলেন, চাকরি, শিক্ষা, করনীতি, প্রশাসনিক পদায়ন ও এনজিও প্রকল্প বাস্তবায়নে এখনও বৈষম্য আছে। সব ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

অপপ্রচার ও বাস্তবতা

প্রতিমন্ত্রী হিসেবে একজন বাঙালি সংসদ সদস্যের নিয়োগকে ঘিরে শুরুতে কিছু গোষ্ঠীর অপপ্রচারের চেষ্টা হলেও তা স্থায়ী প্রভাব ফেলেনি। সাধারণ মানুষের বড় অংশ নতুন নেতৃত্বকে সময় দিতে চান।

প্রত্যাশার পাহাড়

পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন তাকিয়ে আছে নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দিকে। শান্তিচুক্তির জট খুলবে কি না, ভূমি–বিরোধের সমাধান মিলবে কি না, সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদাবাজি বন্ধে দৃশ্যমান উদ্যোগ আসবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে পাহাড়ের ভবিষ্যৎ।

স্থানীয়দের ভাষায়, পাহাড়ে শান্তি চাই, উন্নয়ন চাই। তবে তা হতে হবে সবার জন্য, সমানভাবে।

এখন দেখার বিষয়, নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার বাইরে গিয়ে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে—আর সেই পদক্ষেপ পাহাড়ের আস্থাহীনতা কতটা দূর করতে সক্ষম হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা দীর্ঘদিনের। তবে নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। তাদের স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ যদি বাস্তবে আসে, তা শুধু বিরোধ নিরসন করবে না, বরং বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নের পথও খুলে দেবে।

কী বলছেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো সম্প্রদায়কেই পেছনে রাখা হবে না। সকল সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সবাইকে সমান সুযোগ দেয়া হবে।’

পাহাড়ি অঞ্চলে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার পাশাপাশি কাজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আন্তরিকতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করা নয়, বরং পার্বত্য অঞ্চলে আস্থা, ভালোবাসা ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ তৈরি করা। স্থানীয় মানুষ যেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে নিজের ভূমিকা দেখতে পায় এবং নিজেকে অংশীদার মনে করে, সেটিই আমাদের প্রকৃত সাফল্য।

সর্বশেষ :

আরও পড়ুন: