Home খাগড়াছড়ি পাহাড়ে অর্থ সংকটে ভুগছে ইউপিডিএফ? চাঁদার জন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিকদের কাছে চিঠি!

পাহাড়ে অর্থ সংকটে ভুগছে ইউপিডিএফ? চাঁদার জন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিকদের কাছে চিঠি!

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন অঞ্চলে আবারও অর্থের জন্য পাহাড়ে বসবাসরত নাগরিকদের কাছে চিঠি পাঠাচ্ছে আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফের প্রসীত গ্রুপের কর্মীরা। এই নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

পাহাড় সমুদ্র ডেস্ক

প্রকাশ : ৪ মার্চ ২০২৬, ০১:৩৮

Share

ইউপিডিএফ লোগো

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন অঞ্চলে আবারও অর্থের জন্য পাহাড়ে বসবাসরত নাগরিকদের কাছে চিঠি পাঠাচ্ছে আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফের প্রসীত গ্রুপের কর্মীরা। এই নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে থমকে যাবে পাহাড়ের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন। নতুন বাংলাদেশে আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর এমন অপকর্ম বন্ধ করা না গেলে আগামি দিনে পাহাড়ে অস্থিরতা বাড়বে।

সর্বশেষ গত ৩ মার্চ খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়িতে ‘গণচাঁদা’ বা চাঁদা দেওয়ার জন্য স্থানীয় গ্রামবাসীর কাছে চিঠি ও আদায়ের রশিদ পাঠিয়েছে সশস্ত্র এই আঞ্চলিক গোষ্ঠীর কর্মীরা। এতে চাঁদা পরিশোধের শেষ তারিখ হিসেবে ১৫ মার্চ ডেটলাইনের কথা লিখে দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে মোট ৬টি ক্যাটাগরিতে এই চাঁদার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্যাটাগরিগুলো হলো— প্রথম শ্রেণি ১০০০ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণি ৮০০ টাকা, তৃতীয় শ্রেণি ৬০০ টাকা, ধানের মৌসুমি ৫০০ টাকা, গাছগাছালি বিক্রি ১০০০ টাকা এবং দোকান প্রতি ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা বাধ্যতামূলকভাবে ইউপিডিএফ প্রতিনিধির নিকট জমা দেওয়ার জন্য ১৫ মার্চ সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এর সাথে একটি নির্দিষ্ট ফরমও বিতরণ করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাহাড়ে চাঁদাবাজিকে রীতিমতো শিল্পে পরিণত করেছে সশস্ত্র গ্রুপগুলো। ব্যক্তি পর্যায়ের পাশাপাশি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পেও চাঁদা আদায় করছে সন্ত্রাসীরা, বছরে যা কয়েকশ কোটি টাকা। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হুমকি, অপহরণ আর হত্যার মতো ঘটনাতো নিয়মিত। এতে অনেকটাই অসহায় সাধারণ মানুষ।

গত বছরের ৪ জানুয়ারি ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারির ধোপাছড়ি বাজারে একের পর সন্ত্রাসী হেটে যাচ্ছে অত্যাধুনিক অস্ত্র হাতে। যাদের ইউপিডিএফ সদস্য বলে চেনে স্থানীয়রা।

তাদের এই দল বেধে আসার কারণ, চাঁদাবাজি। তারা চাঁদা না পেয়ে দোহাজারি থেকে ধোপাছড়ি পর্যন্ত সাত কিলোমিটার সড়কের নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয় অস্ত্রের মুখে। এছাড়া যন্ত্রপাতি পুড়িয়ে দেয়ারও হুমকি দেয়।

এলাকাটি চট্টগ্রাম জেলার মধ্যে হলেও সশস্ত্র গ্রুপটির অবস্থান বান্দরবানে। পাহাড়ি জেলাটির সীমান্তবর্তী হওয়ায় এখানে তারা সহজেই আসা যাওয়া করে। এতদিন পাহাড়ে চাঁদাবাজি করলেও এবার নেমে এসেছে সমতলেও।

স্থানীয় একজন বাসিন্দা বলেন, ‘৪৩ জনের একটা বহর, অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে সুশৃঙ্খল সারিবদ্ধভাবে চাঁদা তুলছে। এতো বড় বহর সেনাবাহীনিরও চোখে পড়েনি। আর আমরা তো চট্টগ্রাম জেলায় থাকি বান্দরবানে না, কিন্তু তারা বলতেছে তাদের চাঁদা দিতে হবে’।

স্থানীয়রা আরও জানায়, কিছুদিন আগেও দুইজনের কাছ থেকে ৬০ লক্ষ টাকা নিয়েছে, মহল্লায় বালুর ব্যবসা থেকে শুরু করে ছোট বড় সকল ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা নিচ্ছে তারা।

চাঁদা না দেয়ায় খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলা হয় মোবাইল টাওয়ারে। ফলে অনেক এলাকায় ব্যাহত মোবাইল নেটওয়ার্ক। স্থানীয় বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, শুধুমাত্র রাঙামাটিতেই ইউপিডিএফ বছরে চাঁদা আদায় করে প্রায় ১২০ কোটি টাকা। একই অবস্থা জেএসএস সহ অন্য সংগঠনেরও।

এ বিষয়ে বান্দরবান জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি বলেন, চাঁদাবাজিই এখন আমাদের মুল সমস্যা, আমরা সেটা সমাধানের চেষ্টা করছি। আইনশৃঙ্খলাবাহীনি থেকে শুরু করে প্রশাসনের সবাই সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি কীভাবে এ সমস্যা সমাধান করা যায়।

তাদের চাঁদাবাজি রীতিমতো শিল্পে পরিণত হয়েছে বলে জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও। বাজার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সামান্য একজন কলা বিক্রেতাকেও চাঁদা দিতে হয় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের। এসব সশস্ত্র সংগঠনের চাঁদাবাজি বন্ধে তৎপরতা বাড়ানোর কথা বলছে পুলিশ।

সরকারের একটি সূত্র জানায়, তিন পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলো সবচেয়ে বেশি চাঁদা আদায় করে সরকারি প্রকল্পের ঠিকাদারদের কাছ থেকে। বিগত ১৬ বছরে তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের দ্বারা ২৭৮ বারের মতো অপহরণের ঘটনা ঘটে। এতে ৩৩২ জন অপহরণের শিকার হন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাগড়াছড়িতে সরকারি প্রকল্পের কাজ করা এক ঠিকাদার বলেন, ‘পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের বেশি চাঁদাদাবির কারণে আমার প্রকল্পের কাজ অনেকদিন বন্ধ রেখেছি। পরে বাধ্য হয়ে চাঁদা দিয়ে সমঝোতা করে কাজ উঠিয়ে এনেছি। ইউপিডিএফের লোকজন অস্ত্র দেখিয়ে এ চাঁদা আদায় করে।’

এদিকে খাগড়াছড়ির এমপি ওয়াদুদ ভূইয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেখানে সব ধরনের চাঁদাবাজি এবং নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দমনে পাহাড়ি-বাঙালি সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করবেন।

সর্বশেষ :

আরও পড়ুন: