Home বিশেষ প্রতিবেদন পাহাড়ি ঢাল ও জুমচাষের আড়ালে পপি চাষ, বাড়ছে উদ্বেগ, জড়িত আঞ্চলিক চক্র!

পাহাড়ি ঢাল ও জুমচাষের আড়ালে পপি চাষ, বাড়ছে উদ্বেগ, জড়িত আঞ্চলিক চক্র!

পার্বত্য চট্টগ্রাম–এর দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, সীমিত নজরদারি এবং সীমান্তপথের অপব্যবহারের সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্রগুলো গোপনে পপি চাষ সম্প্রসারণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম অফিস

প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৫৪

Share

পাহাড়ি অঞ্চলে পপি চাষের বিস্তার কেবল অবৈধ আয়ের উৎস নয়, এর পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক উদ্দেশ্য।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি ঢাল ও জুমচাষের আড়ালে পপি চাষের ঘটনায় নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে।

চলতি মাসের গত ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি বান্দরবানের দুর্গম পার্বত্য এলাকা ডিম পাহাড় ও সাঙ্গু নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে অভিযান চালায় নিরাপত্তা বাহিনী। এই সময় ১৭টি স্থানে গড়ে উঠা প্রায় ৪৩ একর অবৈধ পপি ক্ষেত ধ্বংস করে তারা। যার বর্তমান বাজার মূল্য ১০ কোটি টাকার উপরে।

অতীতেও রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান পাহাড়ে মাদক ব্যবসার বিস্তার এবং নিষিদ্ধ পপি ক্ষেতের চাষ বৃদ্ধি করার পেছনে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেতাদের জড়িত থাকার তথ্য একাধিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, পার্বত্য অঞ্চলে মাদকচক্রের বিস্তার ঠেকাতে সীমান্ত নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং ধারাবাহিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। তাদের মতে, পাহাড়ে মাদক উৎপাদনের উৎস ধ্বংস করা গেলে চোরাচালানও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

৫৭ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আকিব জাদেভ জানান, অপরাধীরা প্রশাসনের নজর এড়াতে অত্যন্ত গহিন অরণ্য এবং সীমান্তঘেঁষা জনশূন্য এলাকাগুলোতে পপি চাষ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। কিন্তু আমাদের ধারাবাহিক অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে।

তিনি আরও বলেন, অনেক সময় ভুট্টার মতো সাধারণ ফসলের আড়ালে ‘সাথি ফসল’ হিসেবেও এটি চাষের চেষ্টা করা হয়। যে কারণে অনেকে বুঝতে পারেন না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পাহাড়ি অঞ্চলে পপি চাষের বিস্তার কেবল অবৈধ আয়ের উৎস নয়; এর পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক উদ্দেশ্য। তারা বলছেন, একদিকে তরুণদের মধ্যে মাদকের আসক্তি বাড়িয়ে সামাজিক কাঠামো দুর্বল করা, অন্যদিকে অবৈধ ফসল থেকে অর্জিত অর্থ অস্ত্র সংগ্রহ ও চোরাচালান কার্যক্রমে বিনিয়োগ করাই তাদের এখন অন্যতম লক্ষ্য। 

পাশাপাশি পাহাড়ে চলমান অবকাঠামো নির্মাণ ও পর্যটন উন্নয়ন কার্যক্রমে অস্থিরতা সৃষ্টি করাও এ ধরনের কর্মকাণ্ডের একটি উদ্দেশ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তথ্য অনুযায়ী, পপি থেকে তৈরি হয় আফিম, হেরোইন, মেথাফেটামিন বা ইয়াবা ও আইস এর মতো ভয়ংকর মাদক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম–এর দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, সীমিত নজরদারি এবং সীমান্তপথের অপব্যবহারের সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্রগুলো গোপনে পপি চাষ সম্প্রসারণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গাঁজা ও পপি চাষ সম্প্রসারণের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম–এর আর্থিকভাবে অসচ্ছল জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ইউপিডিএফ, জেএসএস এবং কেএনএফ–এর মতো আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা স্বল্প সময়ে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে স্থানীয়দের এই অবৈধ চাষে যুক্ত করছে।

এছাড়া দরিদ্র কৃষকদের আগাম অর্থ সহায়তা বা বীজ সরবরাহের মাধ্যমে প্রভাবিত করার অভিযোগও উঠেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

কেন অভিযুক্তরা পার পেয়ে যাচ্ছেন?-এমন প্রশ্ন খতিয়ে দেখতে গিয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ঢালে বিচ্ছিন্নভাবে চাষাবাদ হওয়ায় তিন পার্বত্য জেলায় এসব অবৈধ ক্ষেত শনাক্ত করা নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম–এর বিস্তীর্ণ সীমান্তবর্তী অবস্থান, যা মিয়ানমার ও ভারত–এর সন্নিকটে, পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। এই ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে সীমান্তঘেঁষা এলাকায় আঞ্চলিক মাদকপথ গড়ে তুলতে দুই দেশের চক্রগুলোও তৎপর হয়ে উঠেছে।

পাহাড়ের সচেতন বাসিন্দাদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম–এ নিষিদ্ধ পপি চাষ বন্ধে এখনি সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি সেখানে কঠোর নজরদারি জোরদার করা, জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা এবং পাহাড়ি এলাকায় অবৈধ ফসলের পরিবর্তে বৈধ ও লাভজনক কৃষি উদ্যোগ সম্প্রসারণ করার কোন বিকল্প নেই বলেও অভিমত দেন তারা।

থানচির বাসিন্দা সুয়াচাং বাশরী নামের বান্দরবানের একজন বাসিন্দা বলেন, পপি চাষের বিস্তার ঘটলে আমাদের তরুণ প্রজন্ম মাদকের দিকে হাত বাড়াবে। পাহাড়ে এই প্রবণতা ব্যাপক। আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলো নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য এই ধরণের নিষিদ্ধ মাদকের চাষ অব্যাহত রেখেছে। তাদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।

সর্বশেষ :

আরও পড়ুন: