Home বিশেষ প্রতিবেদন পরিশ্রমী পাহাড়ের মানুষও এখন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে, আক্রান্ত প্রায় ৩০ শতাংশ

পরিশ্রমী পাহাড়ের মানুষও এখন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে, আক্রান্ত প্রায় ৩০ শতাংশ

কঠোর পরিশ্রম আর প্রকৃতিঘনিষ্ঠ জীবনযাপনে অভ্যস্ত পাহাড়ের মানুষদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি রোগের প্রকোপ কম — এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে নতুন একটি গবেষণা। গবেষণা বলছে, দুর্গম পাহাড়ি জনপদেও নীরবে থাবা বসাচ্ছে উচ্চ রক্তচাপ। বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ২৯ শতাংশ মানুষ এখন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত।

পাহাড় সমুদ্র ডেস্ক

প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬, ১১:৫২

Share

কঠোর পরিশ্রম আর প্রকৃতিঘনিষ্ঠ জীবনযাপনে অভ্যস্ত পাহাড়ের মানুষদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি রোগের প্রকোপ কম — এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে নতুন একটি গবেষণা। গবেষণা বলছে, দুর্গম পাহাড়ি জনপদেও নীরবে থাবা বসাচ্ছে উচ্চ রক্তচাপ। বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ২৯ শতাংশ মানুষ এখন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত।

আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘ওয়ার্ল্ড জার্নাল অব অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড রিভিউস’-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ আল শাফি মজুমদার ও রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. রাজীব ঘোষ।

পুরুষ ও বিত্তশালীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
রোয়াংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকায় বসবাসকারী ১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব ৬৩৭ জন নারী-পুরুষের উপর চালানো এই সমীক্ষায় আক্রান্তের হার নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি — যথাক্রমে ৩৩.১ এবং ২৪.৩ শতাংশ। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫২ শতাংশ পুরুষ এবং প্রায় ৭৮ শতাংশ মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, ত্রিপুরা ও চাকমাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য। বাকি ২২ শতাংশ বাঙালি। জাতিগত বিভাজনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে আক্রান্তের হার ২৮.১ শতাংশ হলেও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে তা ৩৩.৬ শতাংশ।

সবচেয়ে চমকে দেওয়া তথ্য আসে আয়ের হিসেবে। মাসিক আয় যাঁদের ৫০ হাজার টাকার বেশি, তাঁদের মধ্যে আক্রান্তের হার ৬৬.৭ শতাংশ — সামগ্রিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। গবেষকদের ব্যাখ্যা, আর্থিক সচ্ছলতার সঙ্গে বদলে যাচ্ছে জীবনযাত্রা, বাড়ছে ওজন ও কোমরের পরিধি, কমছে শারীরিক পরিশ্রম — আর সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপ।

তরুণরাও আর নিরাপদ নন
বয়সের গ্রাফে ছবিটা আরও উদ্বেগের। কেবল প্রবীণরা নন, পাহাড়ের তরুণ ও মধ্যবয়সীরাও এই ঝুঁকিতে পড়ছেন। ৩০ বছরের নিচের তরুণদেরও ২২ শতাংশ ইতিমধ্যে আক্রান্ত। ৩০ থেকে ৪৪ বছর বয়সীদের ৩১.৭ শতাংশ, ৪৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সীদের ৩৫.৭ শতাংশ এবং ৬০ বছরের উপরে ৪১.৩ শতাংশ এই রোগে ভুগছেন।

‘জানেন, কিন্তু যেতে পারেন না’
রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও গবেষণা দলের অন্যতম সদস্য সহযোগী অধ্যাপক ডা. রাজীব ঘোষ বলেন, “পাহাড়ি এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস সমতলের চেয়ে ভিন্ন হলেও সেখানে উচ্চ রক্তচাপের এই প্রাদুর্ভাব বেশ উদ্বেগজনক। বিশেষ করে পুরুষদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি হওয়ার পেছনে কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ, জীবনযাপন এবং তামাকজাত দ্রব্য সেবন ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, সচেতনতা থাকা সত্ত্বেও আক্রান্তের হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার অর্থ একটাই — দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা বা আধুনিক চিকিৎসার আওতায় আসছেন না। পাহাড়ের এই মানুষদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এখন থেকেই নিয়মিত স্ক্রিনিং ও বিশেষায়িত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

সমন্বিত উদ্যোগ না হলে সংকট গভীর হবে
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উচ্চ রক্তচাপের বিস্তার ঠেকাতে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত ফ্রি স্ক্রিনিং ক্যাম্পেইন পরিচালনা এবং প্রান্তিক মানুষকে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা ও সুষম খাদ্যাভ্যাসে উদ্বুদ্ধ করতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

সর্বশেষ :

আরও পড়ুন: